ভারতকে ‘ক্রিকেটে গডফাদার’ বলে মেনে নিয়েছে পাকিস্তান!

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ইতিহাস কখনও আচমকা বদলায় না। সে ধীরে ধীরেই নিজের পুরনো ছায়াকেই আরও গাঢ় করে তোলে। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট দ্বৈরথেও ঠিকে সেই ছবিটাই বারবার ফিরে আসে। কথায় বলে হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেলফ। আর ১৫ ফেব্রুয়ারি রবিবারের ম্যাচ যেন তার সবচেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ। ভারতের কাছে হার মানেই পাকিস্তানের ক্ষোঊ, হতাশা আর ভাঙা টিভির ভাইরাল ছবি। এই চেনা দৃশ্য এবারও যেন বদলায়নি। আবারও ভারতের কাছে কচুকাটা হয়ে মাঠ ছাড়ল পাকিস্তান, আর সেই সঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল লাখো পাক সমর্থকের আশা। রবিবারের ম্যাচের আগে পরিস্থিতি কিন্তু একেবারেই অন্যরকম ছিল। টি-২০ বিশ্বকাপে এই নিয়ে অষ্টমবার মুখোমুখি হয়েছিল দুই দেশ। আগের সাত বারের মধ্যেই ছয়বারই জিতেছে ভারত, একবার পাকিস্তান। তবু এবার পাক শিবিরে আশার আলো ছিল প্রবল। আবহাওয়া, পিচ ও পরিবেশ পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের তুলনামূলক বেশি পরিচিত। স্পিন সহায়ক উইকেট, ধীরগতির পিচ সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের বড় অংশই মনে করেছিলেন এবার লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। পাকিস্তানের স্পিন আক্রমণ ভারতীয় ব্যাটিংকে চাপে ফেলতে পারে বলেও মত ছিল অনেকের। সেই আশার রেশ আরও বাড়ে প্রথম ওভারেই অভিষেক শর্মাকে ফিরিয়ে দেওয়া পর। মনে হচ্ছিল ম্যাচের রাশ এবার বুঝি পাকিস্তানের হাতেই।
কিন্তু সেই আশার বেলুনে সুচ ফুটিয়ে দিলেন ঈশান কিষান। কঠিন উইকেটে দাঁড়িয়ে মাত্র ৪০ বলে ৭৭ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন তিনি। যেখানে অন্য ব্যটাররা রান তুলতে রীতিমতো সংগ্রাম করেছেন, সেখানে ঈশান অনায়াসে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে গেছেন। তাঁর ইনিংস শুধু রানই দেয়নি, ম্যাচের মেজাজটাই বদলে দিয়েছিল। ঈশানের আগ্রাসনের উপর ভর করে ভারত তোলে ৭ উইকেটে ১৭৫ রান। যা সেই উইকেটে ছিল কার্যত পাহাড়সম লক্ষ্য। জবাবে নামা পাকিস্তান ব্যাটিং লাইনআপ শুরু থেকেই চাপের মুখে পড়ে যায়। বুমরাহর নিখুঁত লাইন-লেন্থ, হার্দিকের আগ্রাসন আর স্পিনারদের চাপে একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে তারা। শেষ পর্যন্ত ১৮ ওভারে মাত্র ১১৪ রানে গুটিয়ে যায় পাকিস্তান। ৬১ রানের বিশাল ব্যবধানে জিতে সুপার এইটে কার্যত জায়গা করে নেয় ভারত। ম্যাচ শেষ হতেই পাকিস্তানে হতাশার বিস্ফোরণ ঘটে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় একাধিক ভিডিও, যেখানে দেখা যায় ক্ষোভে ব্যাট দিয়ে টিভি ভাঙছেন সমর্থকেরা। বহু বছর ধরেই এই টিভি ভাঙা ট্র্যাডিশন ভারত-পাক ম্যাচের সঙ্গে জড়িয়েছে রয়েছে। যদিও নেটিজেনদের একাংশ দাবি করেছে, ভাইরাল হওয়ার লোভেই কেউ কেউ এমন নাটক করেন। তবু বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভারতের কাছে হার মানেই পাকিস্তানি সমর্থকদের আবেগে ধস। বহু জায়গায় একাধিক বাড়িতে একই সঙ্গে টিভি ভাঙার খবর সামনে এসেছে। এই দৃশ্য আসলে শুধু ক্ষোভ নয়। গভীর হতাশা আর অসহায়তার বহিঃপ্রকাশ।

এই হতাশার ছবি আরও স্পষ্ট হয় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নকভির আচরণে। ম্যাচ শুরুর আগে ক্রিকেটারদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের উৎসাহ দিয়েছিল তিনি। কিন্তু মাঠে সে সবের কোনও প্রতিফলন দেখা যায়নি। পাকিস্তানের পাঁচ উইকেট পড়তেই নকভিকে আর নাকি স্টেডিয়ামে দেখা যায়নি। কিছুক্ষণ পর দেখা যায়, নিরাপত্তারক্ষীদের ঘিরে তাঁর গাড়ি স্টেডিয়াম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ খেলা শেষ হওয়ার আগেই মাঠ ছেড়ে চলে যান তিনি। যেখানে ভারতীয় বোর্ড ও আইসিসির কর্তারা শেষ বল পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন সেখানে নকভির এই আচরণ যেন পাকিস্তান ক্রিকেট প্রশাসনের ভাঙা মনোবলেরই প্রতিচ্ছবি। দলের লজ্জাজনক হার মাঠে বসে দেখার মানসিক শক্তি পর্যন্ত ছিল না বোর্ড প্রধানের। এই ম্যাচের আগে বহু বিশেষজ্ঞই বলেছিলেন, পাকিস্তানের স্পিন আক্রমণ ভারতীয় ব্যাটিংয়ের বড় পরীক্ষা নেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণে ধার ছিল না, পরিকল্পনায় ছিল না বৈচিত্র্য। আর ব্যাটিংয়ে তো ছিল চরম অস্থিরতা। একের পর এক উইকেট হারিয়ে দল যেন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। খেলা শেষে এক পাক সমর্থকের কথায় শোনা যায়, এটা এখন রুটিন হয়ে গেছে। বুমরাহর কোনও জবাব আমাদের নেই। হার্দিককে সামলাতে পারি না। বরাবরের মতো ভারত দারুণ খেলেছে। এই পারফরম্যান্স চললে আমরা কখনও ভারতকে হারাতে পারব না। এই স্বীকারোক্তির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর আত্মসমর্পণ, যেখানে পাকিস্তানি সমর্থকেরাই কার্যত মেনে নিচ্ছেন ভারতের শ্রেষ্ঠত্ব।
ভারতের সঙ্গে লজ্জাজনক হারের পর পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের প্রতিক্রিয়াও উঠে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, তবে সেখানে আবেগের বিস্ফোরণ নয়, বরং চোখে পড়েছে সংযত হতাশা আর দায় স্বীকারের সুর। বাবর আজম এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, এই ফলাফল দলের প্রত্যাশার অনেক নিচে ও সমর্থকদের কষ্ট দেওয়ার জন্য গোটা দলই দায়ী। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও শক্তভাবে ফিরে আসার। মহম্মদ রিজওয়ানও একই সুরে বলেন, এই হার অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কিন্তু লড়াই এখনও শেষ হয়নি। দল ঘুরে দাঁড়াবে। শাহিন শাহ আফ্রিদি সংক্ষেপে সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে জানান, আজ তাঁদের দিন ছিল না, সামনে আরও ভালো করার চেষ্টা করবেন। পাকিস্তান সংযত ভাষায় দুঃখপ্রকাশ আর ঘুরে দাঁড়ানোর আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকছে। অনেকের মতে, যেখানে বারবার ভারতের কাছে হার আত্মবিশ্বাসে এমন আঘাত দিচ্ছে যে ক্রিকেটাররা প্রকাশ্যে বক্তব্য করতে অত্যন্ত সতর্কও হয়ে পড়ছেন।
এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে আরও এখটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বারবার হারের এই ভয়, অপমান আর মানসিক চাপ থেকেই কি পাকিস্তান এই ম্যাচ খেতলে চায়নি? বহু প্রাক্তন পাক ক্রিকেটার সেই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। শোয়েব আখতার একবার বলেছিলেন, ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ মানেই বাড়তি মানসিক বোঝা। হারলে সমালোচনার ঝড় ওঠে যা খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দেয়। ইনজামাম-উল-হকও স্বীকার করেছিলেন, এই ম্যাচে শুধু ক্রিকেট নয়, জড়িয়ে থাকে জাতীয় সম্মান। হার মানেই সারাদেশের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো। এই মন্তব্যগুলো প্রমাণ করে পাকিস্তান দল মাঠে নামার আগেই এক গভীর মানসিক যুদ্ধে লিপ্ত থাকে যার প্রভাব সরাসরি পড়ে পারফরম্যান্সে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বলা যায়, বর্তমান ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ শুধু দুই দলের লড়াই নয়, এটি দুই মানসিকতার সংঘর্ষ। একদিকে আত্মবিশ্বাসী, পরিকল্পিত ও স্থির ভারত। অন্যদিকে আত্মবিশ্বাসহীন পাকিস্তান। তাই প্রতিটি ম্যাচে ফলাফল যেন আগে থেকেই লেখা থাকে। হয়তো ক্রিকেটের নিয়মে চিরস্থায়ী কিছু নেই, ভবিষ্যতে আবারও পাল্টে যেতে পারে ছবিটা। কিন্তু আপাতত বাস্তবতা একটাই ভারতের সামনে পড়লেই পাকিস্তান হারবে। আর সেই হার মেনে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি এখন পাক সমর্থকরাই সবচেয়ে বেশি করে নিচ্ছেন। এই দ্বৈরথে ভারতের আধিপত্য এখন আর কেবল পরিসংখ্যান নয়, তা হয়ে উঠেছে এক নির্মম বাস্তবতা। যা বদলাতে গেলে পাকিস্তান ক্রিকেটকে নিজেদের ভিতরটাই আগে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।