NRC কাঁটায় বিদ্ধ সখিনা বেগম

ঢাকার কারাগারেই থাকতে হবে ভারতের সখিনা বেগমকে

স্বাগতা চন্দ্র সাহা, সাংবাদিক: এক অসহায় বৃদ্ধা। ঢাকার আদালতের বাইরে পুলিশি ঘেরাটোপে শূন্যদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে। শীর্ণকায় শরীর আর চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। এই বয়সে কী এমন দোষ করলেন যে তাঁকে নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত এই দুই দেশের মধ্যে এত টানাপড়েন । জামিনের আবেদনও খারিজ করে দিয়েছে ঢাকার আদালত। জামিন খারিজ হতেই তাঁকে ফেরানো নিয়ে সোশ্যাল মাধ্যম তোলপাড়। দুই দেশের মা হয়ে উঠেছেন সখিনা বেগম। আপাতত ঢাকার কারাগারেই থাকতে হবে ভারতের সখিনা বেগমকে।

সখিনা বেগম। আসামের বাসিন্দা। গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে তাকে আটক করে আসাম পুলিশ। আসামের নলবাড়ি জেলার বরকুড়া গ্রামের বাড়ি থেকে পুলিশ নিয়ে যায়। এরপর তাকে হস্তান্তর করা হয় বিএসএফের হাতে। সেখান থেকে পুশব্যাক করা হয় বাংলাদেশে। বাংলাদেশের রাস্তায় অসহায় অবস্থায় তাঁকে এক পরিবার নিয়ে যায় মিরপুরে। সেই পরিবারেই থাকছিলেন সখিনা বেগম। তাঁর কথা জানতে পেরে তদন্ত হয়, পরে মিরপুরের ভাষানটেক পুলিশ গ্রেফতার করে। এখান থেকে শুরু হয় গল্প। এক ভিনদেশে অসহায় বৃদ্ধার জীবনের টানাপড়েনের গল্প। একদিকে সখিনা বেগম কারাগারে বন্দী অন্যদিকে মাকে ফিরে পাবার কাতর আকুতি মেয়ের। ভারত-বাংলাদেশ এই দুই দেশ ছাড়িয়ে সখিনা বেগমের মর্মান্তিক পরিণতির কথা ছড়িয়েছে পড়েছে দিকে দিকে। জীবন সায়াহ্ণে এসে এ কেমন সাজা। কোনও অপরাধ না করেই কারাগারে বন্দী থাকতে হচ্ছে এক অসহায় বৃদ্ধাকে। যার শারীরিক পরিস্থিতিও ভালো নেই।

বেশ তো ছিলেন আসামে। হঠাত করে এনআরসি জটে কয়েকটা কাগজ না থাকায় তাঁকে অনুপ্রবেশকারীর তকমা দেওয়া হয়। পরিবার পরিজনদের থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বলপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়। রাতারাতি তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশি। অভিযোগ শুধুমাত্র তাঁর ভাষা ও ধর্মের কারণে বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে তো পাঠানো হয় তারপর…। সেখানেও চরম হেনস্থার শিকার ওই প্রবীণ সখিনা। তাঁর কাছে তো বাংলাদেশের পাসপোস্ট নেই। সেখানেও তিনি অনুপ্রবেশকারী। কী করে থাকবেন বলুন তো। সখিনা বেগম তো নিজে আসেননি। তাঁকে জোরপূর্বক আবর্জনার মতোই ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। যে মানুষটার জীবন কেটেছে সংসার, সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে তাঁর কাছে কিনা চাওয়া হচ্ছে নাগরিকত্বের পরিচয়, এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার প্রমাণ। সখিনা বেগম যিনি একা ঘরের চৌকাঠ ডিঙোতে ভয় পেতেন তিনি এখন অন্য দেশের কারাগারে বন্দী। গত ১৭ নভেম্বর তাঁর জামিন মামলার শুনানি ছিল। আদালতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে সখিনা বেগম অনুপ্রবেশকারী। তাঁকে এই মুহূর্তে জামিন দেওয়া সম্ভব নয়। জামিন মিললেই নাকি তিনি ভারতে পালাবেন। আপাতত কারাগারে রেখে তাঁর চিকিৎসা চলবে। যদিও বাংলাদেশে ভালো মানুষের অভাব নেই। সখিনার পাশে দাঁড়িয়েছে এক পরিবার। তাঁরাও সখিনাকে ভারতে পাঠানোর জন্য আইনি লড়াই লড়ছেন। সখিনা বেগমকে ভারতে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালাচ্ছে আসামের বড়োল্যান্ড স্বশাসিত এলাকার সংখ্যালঘু মুসলিম ছাত্রদের একটি সংগঠন।

এদিকে সখিনা বেগমের ফের কারাবাসের খবর পেতেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তাঁর মেয়ে। শেষ বয়সে মায়ের সেবা করতে চেয়ে কাতর প্রার্থনা করেছন তিনি। সখিনা বেগমের মেয়ের কান্নায় ভেঙে পড়ার ছবিও ভেসে উঠেছে সোশ্যাল মাধ্যমে।

অন্যদিকে সখিনা বেগমের জামিন খারিজ হতেই সোশ্যাল মাধ্যমে বইছে নিন্দার ঝড়। ভারত-বাংলাদেশের এই দুই দেশের নেটাগরিকরা ঘটনার নিন্দা করে সখিনা বেগমের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন…. কেউ লিখেছেন..


বৃদ্ধ মহিলার বিষয়টি মানবিক বিবেচনা করা যেতে পারে

উনাকে সম্মানের সহিত ভারতে পাঠানো হোক। বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে। সেটা কি মাথায় নেই নাকি

সে অনুপ্রবেশকারী নয় তাকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছে। আইন অন্ধ নয়, আইনের লোকেরাই অন্ধ।

মুসলিম হওয়াই যত জুলুম

এইসমস্ত নানা হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া বার্তায় ছেয়ে গেছে সোশ্যাল মাধ্যম। বাংলাদেশের আইন সখিনাকে কারাগারে বন্দী করলেও সে দেশের মানুষ সখিনার পাশেই দাঁড়িয়েছে। কবে যে সখিনা বেগমের মুক্তি মিলবে তা জানা নেই। তবে তাঁর দ্রুত মুক্তির দাবি জোরালো হচ্ছে।