দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক লক্ষ্য, আঞ্চলিক ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে তাদের অবস্থান ঠিক কীভাবে ভিন্ন ?

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পারমাণবিক বাস্তবতার এক অদ্ভুত বৈপরীত্য বিশ্বরাজনীতির অঙ্ক অনেক সময় সরল যুক্তির পথ মেনে চলে না। কখনও কখনও বাস্তবতার ছবিটা এমনভাবে বদলে যায় যে কাগজে কলমের হিসাব আর রাজনৈতিক উদ্বেগের মানচিত্র একে অপরের সঙ্গে মেলে না। পারমাণবিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই এক বৈপরীত্য দেখা যায়। একদিকে উত্তর কোরিয়া যাদের হাতে ইতিমধ্যেই বহু পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং যারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত আঘাত হানার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। অন্যদিকে ইরান যারা দীর্ঘদিন ধরে উন্নতমানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালিয়ে গেলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক নয়।
তবু আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রায়ই উত্তর কোরিয়ার চেয়ে ইরানই বেশি জায়গা দখল করে। ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক তৎপরতা, নিষেধাজ্ঞা নীতি, সামরিক প্রস্তুতি কিংবা মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে কৌশলগত আলোচনায় তেহরানের উপস্থিতি অনেক সময়ই যেন লাল সংকেতের মতো দেখা যায়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে রাষ্ট্র ইতিমধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী, তার চেয়ে বেশি উদ্বেগ কেন এমন একটি দেশকে ঘিরে, যার হাতে এখনো সেই অস্ত্র পৌঁছায়নি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু অস্ত্রের সংখ্যা বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিকে তাকালেই চলবে না। বরং দেখতে হবে এই দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক লক্ষ্য, আঞ্চলিক ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে তাদের অবস্থান ঠিক কীভাবে ভিন্ন। প্রথমত, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির মূল লক্ষ্য অনেকটাই প্রতিরক্ষামূলক। কিম শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই পারমাণবিক অস্ত্রকে একটি নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে দেখে এসেছে যা তাদের শাসনব্যবস্থাকে বহিরাগত সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করবে। উত্তর কোরিয়া কার্যত একটি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র। তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের মতাদর্শিক বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করে না, কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক কাঠামো বদলে দেওয়ার মতো আঞ্চলিক প্রকল্পেও তেমন সক্রিয় নয়। তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অনেকটাই একটি সতর্কবার্তার মতো আমাদের স্পর্শ করো না। অন্যদিকে ইরানের ভূরাজনৈতিক চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। তেহরান বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করে আসছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস, ইয়েমেনে হুথি এবং ইরাক ও সিরিয়ায় বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া এই বিস্তৃত প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বড় উদ্বেগ হলো যদি ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে সেই অস্ত্র একটি পারমাণবিক ছাতা হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ পারমাণবিক প্রতিরোধের নিরাপত্তা পেয়ে তেহরান হয়তো তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড আরও জোরালোভাবে পরিচালনা করতে সাহস পাবে।
দ্বিতীয়ত, ভূগোলও এই সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখে।
উত্তর কোরিয়া কার্যত তিনটি বড় শক্তির মধ্যে ঘেরা চীন, রাশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের শক্তিশালী সামরিক সমর্থন। ফলে কোনো সংঘাত শুরু হলে সেটি ভয়াবহ হলেও অনেকাংশে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া চীনও উত্তর কোরিয়ার ওপর একটি নীরব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে আগ্রহী, কারণ তাদের সীমান্তে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে সেটি বেইজিংয়ের জন্যও গুরুতর সংকট তৈরি করতে পারে। কিন্তু ইরানের অবস্থান ভৌগোলিকভাবে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। এই সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালীও সাম্প্রতিক সময়ে ইরান সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর কার্যকলাপের কারণে আলোচনায় এসেছে। যদি পারমাণবিক শক্তিধর ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তবে তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।
তৃতীয়ত, পশ্চিম এশিয়া সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় উদ্বেগ। এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ধর্মীয় বিভাজন এবং কৌশলগত সংঘাতের কারণে অস্থির। যদি ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয় তবে অনেক দেশ নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একই পথে হাঁটার কথা ভাবতে পারে। সৌদি আরব ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে তারাও সেই পথে এগোতে বাধ্য হতে পারে। তুরস্ক কিংবা মিশরের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলিও তখন নিজেদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বহু রাষ্ট্রের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে যা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য এক নতুন ও বিপজ্জনক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। সবশেষে রয়েছে আরেকটি বাস্তবতা যাকে বলা যায় সীমা অতিক্রমের আগের মুহূর্ত। উত্তর কোরিয়া অনেক আগেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে সেই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে তাদের কৌশলকে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের দিকে সরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু ইরান এখনো সেই শেষ সীমা অতিক্রম করেনি। তারা প্রযুক্তিগতভাবে সেই ক্ষমতার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হয়নি। এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা এখনো প্রতিরোধের অবস্থানে রয়েছে তারা চেষ্টা করছে যাতে ইরান সেই শেষ পদক্ষেপটি না নেয়।
এই পুরো বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের সামনে দাঁড় করায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে হুমকির পরিমাণ শুধু অস্ত্রের সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না, বরং নির্ধারিত হয় সেই অস্ত্রের সম্ভাব্য ব্যবহার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং আঞ্চলিক প্রভাবের ওপর। উত্তর কোরিয়া মূলত নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক অস্ত্র ধরে রেখেছে এমনটাই অনেক বিশ্লেষকের ধারণা। আর ইরানকে ঘিরে উদ্বেগের কারণ হলো তাদের সম্ভাব্য পারমাণবিক ক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত তাই বলা যায় যে, কখনও কখনও সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয় সেই শক্তিকে ঘিরে, যার হাতে অস্ত্র এখনো পৌঁছায়নি কিন্তু যার সম্ভাবনা ভবিষ্যতের পুরো রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে। আর ঠিক সেই কারণেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় ইরানের নাম অনেক সময় এমন এক সতর্ক সংকেত হয়ে ওঠে যা শুধু একটি দেশের নয়, বরং কখনও কখনও পুরো বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়েই নতুন প্রশ্ন তোলে।