ইরান সরকার স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে মোজতবা খামেনেইকে রক্ষা করাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন করে অশনি সংকেত। একদিকে ক্ষমতার পালাবদল অন্যদিকে প্রতিশোধ আর হুমকির ঘনঘটা। সবমিলিয়ে ইরানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অন্যরকম পরিস্থিতি। নিহত প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনেইকে ঘিরে শুরু হয়েছে যে এক নতুন অধ্যায়। ইরানের নবনির্বাচিত সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে সামনে আসার পর থেকেই তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সেই কারণেই তাঁর সুরক্ষার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে দেশের অন্যতম শক্তিশালী সন্ত্রাসদমনকারী গোয়েন্দা বাহিনী নোপোর হাতে। ইরানে জঙ্গি দমন ও বিশেষ অভিযানে দক্ষ বলে পরিচিত এই বাহিনী যদিও আন্তর্জাতিক মহলে বহুবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে। তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান সরকার স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে মোজতবা খামেনেইকে রক্ষা করাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
তবে নিরাপত্তার এই কড়া বলয়ের মাঝেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শোনা যাচ্ছে আরও বিস্ফোরক সুর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিক সাক্ষাৎকারে সরাসরি হুমকির সুরে জানিয়েছেন যদি ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ না করে ও আমেরিকার শর্ত না মেনে চলে তাহলে মোজতবা খামেনেইও নিরাপদ থাকবেন না। তাঁর কথায়, প্রয়োজনে ইজরায়েলের সহযোগিতায় আবারও বিশেষ অভিযান চালানো হতে পারে। এই মন্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, এটি কূটনৈতিক ভাষা নয় বরং সরাসরি শক্তি প্রদর্শনের ইঙ্গিত। সমালোচকদের মন্তব্য বাবাকে হত্যার পর এবার ছেলের পালা। এই ধরনের রাজনৈতিক বার্তা যেন পরিস্থিতিকে আরও অগ্নিগর্ভ করে তুলছে। একদিকে এত দিন জনসমক্ষে না আসা নিয়ে নানা জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মুখ খুলেছেন ইরানের নবনির্বাচিত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই। তাঁর নীরবতা নিয়ে দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠেছিল তিনি কোথায়, কেমন আছেন, আদৌ সুস্থ আছেন কি না। সেই রহস্যের জট কিছুটা খুলে দেন সাইপ্রাসে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলিরেজা সালারিয়ান। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ চত্বরে যে ভয়াবহ হামলা হয়েছিল তাতে গুরুতর জখম হয়েছিলেন মোজতবাও। বিস্ফোরণের অভিঘাতে তাঁর হাত ও পায়ে মারাত্মক চোট লাগে ও দীর্ঘ সময় ধকে তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। সেই কারণেই এতদিন জনসমক্ষে আসা সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। ওই হামলার সময় পরিবারের বহু সদস্যই উপস্থিত ছিলেন স্ত্রী, সন্তান, পুত্রবধূ, জামাই, নাতি-নাতনি সবাই একসঙ্গে ছিলেন প্রাসাদে। ফলে ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যেই এক ভয়াবহ পারিবারিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়। নিহতদের তালিকায় শুধু আলি খামেনেই নন তাঁর স্ত্রী, এক মেয়ে, এক জামাই, মোজতবার স্ত্রী, তাঁদের ছেলে ও মাত্র ১৪ মাস বয়সী এক নাতনিও প্রাণ হারায়। সেই রক্তাক্ত রাত ইরানের রাজনীতির ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে। যার অভিঘাত এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি ইরান।
এই ঘটনার পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে বাড়তে থাকে নতুন আশঙ্কা। ইরানের কূটনৈতিক মহলও বুঝতে পারছে পরিস্থিতি এখনও স্থিতিশীল নয়। রাষ্ট্রদূত সালারিয়ান তাই স্পষ্টভাবেই সতর্ক করে দিয়েছেন তাঁদের আশঙ্কা ভবিষ্যতেও মোজতবা খামেনেইকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা হতে পারে। তাঁর এই আশঙ্কাকে আরও উসকে দিয়েছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য। একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যদি ইরান আমেরিকার দাবি বিশেষ করে পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ বন্ধ করার শর্ত না মেনে চলে তবে মোজতবা খামেনেইও রেহাই পাবেন না। তাঁর কথায় ইজরায়েলের সহযোগিতায় আবারও বিশেষ অভিযান চালানো হতে পারে ও সেই পদক্ষেপকে তিনি সম্পূর্ণ সমর্থন করবেন। মার্কিন প্রশাসনের কিছু সামরিক সূত্রও ইঙ্গিত দিয়েছে, যদি এমন কোনও অভিযান বাস্তবায়িত হয় তবে ২৮ ফেব্রুয়ারির অভিযানের মতোই পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে ইজরায়েল। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষা ছাড়িয়ে এই বক্তব্য যেন সরাসরি শক্তি প্রদর্শনের বার্তাই দিচ্ছে যা পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
ফলে গোটা পরিস্থিতি এখন এক অদ্ভূত অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে সদ্য পিতৃহারা এক নেতা যিনি নিজেই প্রাণঘাতী হামলা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে ফিরেছেন। অন্যদিকে বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির কড়া হুঁশিয়ারি ও রাজনৈতিক চাপ। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ঘটনাপ্রবাহ এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে রাজনীতির নির্মম বাস্তবতাই যেন সামনে চলে আসছে। বাবাকে হত্যার পর কি এবার ছেলের পালা? যদিও এই প্রশ্নের উত্তর এখনও সময়ই দেবে। কিন্তু পরিস্থিতি যে দ্রুত বিপজ্জনক দিকে এগাচ্ছে তা নিয়ে সংশয় নেই। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে পশ্চিম এশিয়ার ক্ষমতার রাজনীতি প্রায়ই ব্যক্তিগত শোককে আন্তর্জাতিক সংঘাতে রূপান্তরিত করে। আজ সেই ইতিহাসেরই আরেকটি নতুন অধ্যায়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে ইরান। এখন দেখার এই উত্তেজনা কি শেষ পর্যন্ত নতুন সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যাবে। নাকি কূটনীতির পথে কোনও সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। কারণ এই মুহূর্তে পুরো বিশ্বের নজর গিয়ে ঠেকেছে এক ব্যক্তির দিকে আর তিনি হলেন মোজতবা খামেনেই।