ইরান এখনও অদম্য, চিন্তায় ট্রাম্প !

কীভাবে ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে? কেন হরমুজ প্রণালী এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু?

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন শুধুই আঞ্চলিক সংঘাত নয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের সামরিক অভিযানের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেছে। এই সংঘাত এখন জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব রাজনীতিকে বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। কীভাবে ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে? কেন হরমুজ প্রণালী এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু? যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধ কতটা ব্যয়বহুল এবং সামনে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে?

সংঘাতের সূচনা হয় যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলা চালায়। এই হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব। সেই অভিযানে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই। হামলায় ইরানের আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনায় অনেকেই মনে করেছিলেন, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো।

শীর্ষ নেতৃত্ব হারানোর পরও ইরানের সরকার পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বিশ্লেষকদের মতে, এর অন্যতম কারণ হল ইরানের বিকেন্দ্রীকৃত প্রতিরক্ষা কৌশল। এই কৌশলকে বলা হয় “মোজাইক ডিফেন্স”। এর ফলে একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সামরিক কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়ে না। খামেনির মৃত্যুর পর খুব দ্রুতই ইরান নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ করেছে। এর ফলে প্রশাসনিক কাঠামো আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ইরান তিন স্তরের কৌশল অনুসরণ করছে। প্রথমত, নিজেদের রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা। দ্বিতীয়ত, পাল্টা হামলার সক্ষমতা বজায় রাখা। আর তৃতীয়ত, যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা। কারণ যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ তত বাড়বে। আর সেটিই ইরানের অন্যতম কৌশল।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখন হরমুজ প্রণালী। এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। পশ্চিম এশিয়ার তেল রপ্তানির বড় অংশ এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়। ইরান এই পথ কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। অনেক দেশে ইতিমধ্যেই জ্বালানি রেশনিং শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের মতো কিছু দেশে পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী পর্যন্ত মোতায়েন করতে হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচলেও প্রভাব পড়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা বহু বিদেশি নাগরিক সেখান থেকে চলে যাচ্ছেন।

এই যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বড় প্রভাব পড়েছে। জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। বিমা খরচও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে অনেক দেশের পণ্য রপ্তানি আটকে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে কেনিয়ার চা শিল্প বড় সমস্যার মুখে পড়েছে। চা পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় গুদামে বিপুল পরিমাণ পণ্য জমে রয়েছে।

যুদ্ধ এখন শুধু ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। লেবাননে ইরান সমর্থিত সংগঠন হেজবোল্লাহ
ইজরায়েলের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানের ড্রোন হামলার লক্ষ্য হয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ট্যাঙ্কার। দুবাইয়ের উপকূলেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে যুদ্ধের বিস্তার এখন তুরস্ক, সাইপ্রাস এবং উপসাগরীয় দেশগুলো পর্যন্ত পৌঁছেছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপপুঞ্জে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। এই দ্বীপটি ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র। ইরানের অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল এখান থেকেই বিদেশে পাঠানো হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই হামলায় দ্বীপটির সব সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে। যদিও তেল শোধনাগারে এখনও হামলা করা হয়নি। কিন্তু হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে সেখানেও হামলা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটন।

এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই প্রায় ১১.৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। শুরুতে প্রতিদিন প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে সেই ব্যয় কমে দিনে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে শুধু অস্ত্রের খরচ ধরা হয়েছে। সেনা মোতায়েন, চিকিৎসা খরচ বা যুদ্ধবিমান ক্ষতির মতো খরচ এতে ধরা হয়নি।

এই অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্র। এর মধ্যে রয়েছে Joint Standoff Weapon নামের গ্লাইড বোমা। প্রতিটি বোমার দাম প্রায় ৫ লক্ষ থেকে ৮ লক্ষ ডলারের মধ্যে। পরে তুলনামূলক কম খরচের অস্ত্র ব্যবহার শুরু হয়েছে। যেমন Joint Direct Attack Munition বা JDAM।

এই যুদ্ধ এখন মার্কিন রাজনীতিতেও বড় চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। অনেক রিপাবলিকান নেতা হোয়াইট হাউসে উদ্বেগ জানাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে ইরানও কঠিন অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটি ধীরে ধীরে একটি “জম্বি স্টেট”-এ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ সরকার টিকে থাকলেও অর্থনীতি প্রায় অচল হয়ে পড়তে পারে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেওয়া নিয়েও সমস্যা তৈরি হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে দুটি কঠিন পথ খোলা রয়েছে। প্রথম পথ- স্থলবাহিনী নামিয়ে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করা। দ্বিতীয় পথ- ইরানের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দিয়ে অভ্যন্তরীণ সংঘাত তৈরি করা। দুটিই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরান যুদ্ধ এখন পশ্চিম এশিয়ার সীমা ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বকে প্রভাবিত করছে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিঘ্ন এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ কৌশলগত সুবিধা পাবে- তা এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার- পশ্চিম এশিয়ার এই সংঘাত এখন পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।