যুদ্ধের উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে এই গুঞ্জন যেন ভূমিকম্পের মতোই নাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বরাজনীতির অঙ্গনকে।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি এমনিতেই অগ্নিগর্ভ। প্রতিদিনই যেন নতুন উত্তেজনা, নতুন অনিশ্চয়তা নিয়ে হাজির হচ্ছে। তার মাঝেই হঠাৎ এক ভাইরাল খবর ছড়িয়ে পড়তেই যেন বিশ্ব রাজনীতির মাটিই কেঁপে উঠল। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নাকি নিহত হয়েছেন। খবরটির প্রকাশের পর থেকেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। যদিও এই দাবির পক্ষে এখনো কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সামনে আসেনি। তবুও যুদ্ধের উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে এই গুঞ্জন যেন ভূমিকম্পের মতোই নাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বরাজনীতির অঙ্গনকে।
এই গুঞ্জনের সূত্রপাত ইরানের আধাসরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে। সেখানে দাবি করা হয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নেতানিয়াহুর সরকারি বাসভবন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। সেই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ইজরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই হামলায় নেতানিয়াহু নিহত হয়েছেন ও বেন গভির আহত হয়েছেন। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ ছবি, ভিডিও বা নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বরং কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্য ও পরিস্থিতিগত ইঙ্গিতকে একত্র করে একটি নাটকীয় বর্ণনা তৈরি করা হয়েছে। যা নতুন করে নানা জল্পনা কল্পনার জন্ম দিয়েছে। তাসনিমের প্রতিবেদনে এই দাবির উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে রাষ্ট্রসংঘের সাবেক অস্ত্র পরিদর্শক স্কট রিটারের নামে সামাজিক মাধ্যম এক্স হ্যান্ডলে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টে। ওই পোস্টে বলা হয় যে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র নেতানিয়াহুর লুকিয়ে থাকার স্থান বা বাসভবনে আঘাত হানে এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। একই সঙ্গে আরও দাবি করা হয় যে ওই হামলায় নেতানিয়াহুর ছোট ভাই ইদ্দো নেতানিয়াহু নিহত হয়েছেন। কিন্তু যে অ্যাকাউন্ট থেকে এই পোস্টটি করা হয়েছে সেটি সত্যিই স্কট রিটারের কি না বা সেটি ভুয়ো কি না সেই বিষয়টি এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে পুরো ঘটনাটি আরও বেশি সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।

প্রতিবেদনটিতে সরাসরি হামলার কোনও প্রমাণ না থাকলেও কয়েকটি পরিস্থিগত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। যেমন সাম্প্রতিক সময়ে নেতানিয়াহুর নতুন কোনও ভিডিও প্রকাশ না হওয়া। তার বাসভবনের আশপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কূটনৈতিক সফর হঠাৎ স্থগিত হয়ে যাওয়া ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে নেতানিয়াহুর একটি ফোনালাপের অস্পষ্ট বিবরণ। এসব তথ্যকে একত্র করে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে যেন কোনো বড় ঘটনা ঘটেছে। যদিও তার সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি পশ্চিম এশিয়ার চলমান যুদ্ধের পরিচিত কৌশলের অংশ। বাস্তব তথ্যের ছোট ছোট খণ্ডাংশকে জোড়া লাগিয়ে একটি নাটকীয় গল্প তৈরি করা হয় এবং পরে সেটিকে এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয় যেন কোনো গোপন বড় ঘটনার আড়ালে রাখা হয়েছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে সাধারণত ইরানের শক্তিশালূ সামরিক বাহিনী আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগও এই সংস্থাটিকে আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করেছে। তবে প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য এই গুঞ্জনের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ৭ মার্চ নেতানিয়াহুর নামে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছিল। তার আগের দিন তিনি দক্ষিণ ইজরায়েলের বিরশেবা শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একটি ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করেছিলেন বলে সরসারি ওয়েবসাইটে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে তার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথাও উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর সঙ্গে তার একটি ফোনালাপ, যা ফরাসি প্রেসিডেন্টের দফতর থেকেও নিশ্চিত করা হয়েছে।
এর আগেও যুদ্ধ চালাকালীন নেতানিয়াহুর অবস্থান ও নিরপত্তা নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা গুজব ছড়িয়েছে। এক পর্যায়ে ইরানের সামরিক সূত্র দাবি করেছিল যে একটি হামলার পর নেতানিয়াহুর ভাগ্য অস্পষ্ট। তবে পরে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কার্যলয় সেই দাবিকে সরাসরি ভুয়ো খবর বলে উড়িয়ে দেয়। একই ধরনের একটি ঘটনার পর চিনের রাষ্ট্রীয় সিনহুয়া নিউজ এজেন্সিও জানায়, জেরুজালেমে নেতানিয়াহুর কার্যালয়ে আশপাশে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের সময় তথ্যের ঘাটতি বা অস্পষ্টতা অনেক সময়ই বড় ধরনের গুজবের জন্ম দেয়। একটি নতুন ভিডিও না থাকা, কোনো কূটনৈতিক সফরের সময়সূচি বদলে যাওয়া কিংবা কোনো অস্পষ্ট সরকারি বিবৃতি। ফলে নেতানিয়াহুর মৃত্যুর এই দাবি আপাতত প্রমাণহীন জল্পনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। তবুও এই ঘটনার একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। যুদ্ধের সময় তথ্য শুধু খবর নয়, অনেক সময় তা হয়ে ওঠে কৌশল ও মানসিক লড়াইয়ের অস্ত্র। তাই পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতে প্রতিটি দাবি যেন ভূমিকম্পের ক্ষুদ্র কম্পনের মতো যা মুহূর্তেই নাড়িয়ে দিতে পারে বিশ্বরাজনীতিকে।