অন্তত ১০১ জন নিখোঁজ হন। আহত ৭৮ জন। হামলাকারী আমেরিকাই ?

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ। আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। বলা যেতে পারে আরব দুনিয়ায় সংঘাত যত দিন যাচ্ছে, ততই বেড়েই চলেছে। ইরানে লাগাতার হামলার চালাচ্ছে ইজরায়েল ও আমেরিকা। দেশটির নিরাপত্তা সংক্রান্ত দফতর এবং একটি মিসাইল লঞ্চার গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইজরায়েল। যুদ্ধে এখনও পর্যন্ত শুধু ইরানেই মৃত্যু হয়েছে এক হাজারের বেশি। ইরান ৫০০ ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ২০০০ ড্রোন হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানে ২০০০-র বেশি টার্গেটে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা ও ইজরায়েল। একে একে বাড়ছে যুদ্ধের পরিধি। আরব দুনিয়ায় সেই সংঘাত এবার ছড়িয়ে পড়ল ভারতের কাছে। শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে এক ইরানি জাহাজে ভয়াবহ বিপর্যয়। ইরানের সঙ্গে ইজরায়েল ও আমেরিকার লড়াই কি ক্রমেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আকার নিতে চলেছে ?
আকাশপথ, স্থলপথ ছাড়িয়ে এবার বাদ গেল না জলপথও। ইরানের নৌবাহিনীর এক জাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’ জাহাজে ছিলেন ১৮০ জন। বুধবার ভারত মহাসাগরের উপর শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ দিকের বন্দর শহর গল থেকে ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে ছিল সেটি নৌবাহিনীর জাহাজটি। শ্রীলঙ্কা উপকূলে ইরানের জাহাজটিকে ধাক্কা মারে একটি ডুবোজাহাজ বা সাবমেরিন। এই ঘটনায় অন্তত ১০১ জন নিখোঁজ হন। আহত হন ৭৮ জন। ডুবন্ত জাহাজটি থেকে বুধবার ভোর ৫টা ৮ মিনিটে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠানো হয় শ্রীলঙ্কার সেনাকে। সমুদ্রের বুকে আচমকা এই আঘাতের পর শুরু হয় উদ্ধার তৎপরতা। শ্রীলঙ্কার জলসীমার অদূরে এই ঘটনা। এই হামলা আমেরিকাই চালিয়েছে। স্বীকার করে নিল আমেরিকা।
মজ ক্লাসের একটি ফ্রিগেট আইআরআইএস ডেনা। আন্তর্জাতিক যৌথ প্রদর্শনী ও মহড়ায় যোগ দিতে ইরানের আইরিস দেনা নামক ফ্রিগেট শ্রেণির জাহাজটি বিশাখাপত্তনমে এসেছিল। চারবছর অন্তর ভারতের রাষ্ট্রপতির পর্যবেক্ষণে এই কর্মসূচি হয়। মহড়ার শেষে জাহাজটি ইরানে ফিরছিল। এখানেই উঠছে এক প্রশ্ন। একটি মিত্র দেশ থেকে প্রদর্শনী শেষ দেশে ফেরার পথে কেন আক্রমণ করা হল? যদিও ভারতীয় নৌসেনার তরফে এ বিষয়ে কোনও বিবৃতি জারি করা হয়নি।
শুরুতে বোঝা যায়নি জাহাজটি কীভাবে আক্রান্ত হল। কারণ আক্রমণের তেমন কোনও চিহ্ণ দেখতে পাওয়া যায়নি। শ্রীলঙ্কার বায়ুসেনারও সমুদ্রে কিছু চোখে পড়েনি। ফলে অনুমান করা হচ্ছে. ডুবোজাহাজ থেকেই আক্রমণ চালানো হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর মুখপাত্র কমান্ডার বুদ্ধিকা সম্পত জানান, তাঁরা ওখানে পৌঁছে দেখতে পান সমুদ্রে প্রচুর তেল পড়ে রয়েছে। এবং জাহাজটি ডুবছে। তিনি জানান, সেই মূহুর্তে তাঁদের প্রথম দায়িত্ব ছিল উদ্ধারকাজ সম্পূর্ণ করা। শ্রীলঙ্কার বিদেশমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ সংসদে জানান, শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী তথ্য পেয়েছে যে ১৮০ জন আরোহী নিয়ে আইআরআইএস ডেনা জাহাজটি মাঝপথে বিপদে পড়ে। এই প্রসঙ্গে , গত শনিবার আমেরিকা ও ইজরায়েলের ইরানে বিমান হামলার পর থেকে ইরান ধারাবাহিকভাবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। সোমবার পর্যন্ত পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি, তেল সংশোধনাগার লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোন আঘাত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দাবি, মার্কিন তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ৯০ শতাংশেরও বেশি হারে এই হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এভাবে ব্যয়বহুল ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবহার করে কতদিন প্রতিরক্ষা চালানো সম্ভব? সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকেই পরিষ্কার হয়েছে, কম খরচের অস্ত্র দিয়ে উচ্চমূল্যের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলা যায়।
যুদ্ধের বাজারে কে বন্ধু বা কে শত্রু তা বোঝা বড় দুষ্কর ব্যপার। এই যেমন আমেরিকা যে ইজরায়েলের পক্ষে। তারা জোট বেঁধে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। অন্যদিকে কমিউনিস্ট দেশ হিসাবে পরিচিত চিনের জন্যই শুধুমাত্র নিজেদের দখলে থাকা হরমুজ প্রণালী খুলে রাখার কথা জানায় ইরান। প্রকৃতপক্ষে শত্রুর শত্রু বন্ধু মনোভাব দেখাচ্ছে তেহরান। ফলে এখনও পর্যন্ত সরাসরি কোনও পক্ষ না নেওয়ায় নয়াদিল্ল কিছুটা সংকেটেই।
ইতিমধ্যেই বাজারে যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। শেয়ার বাজারে ধস নামছে। হু হু করে পড়ছে টাকার দাম। যুদ্ধ বেশিদিন চললে ভারতের তেলের সঞ্চয়ে টান পড়বে। যা অর্থনীতির জন্য বিরাট ধাক্কার কারণ হতে পারে। এই সংকটে ফের নয়াদিল্লির পাশে দাঁড়ানোর বার্তা বন্ধু রাশিয়ার। ৯৫ লক্ষ ব্যারেল রুশ তেল নিয়ে ভারতের জলসীমার আশপাশেই ঘোরাফেরা করছে একটি নৌবহর। নয়াদিল্লি সাহায্য চাইলেই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই তেল পৌঁছে যাবে ভারতে। এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছেন রাশিয়ার আধিকারিকরা।