সত্যিই কি আত্মঘাতী আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়?

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠি নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : রাতেও সবকিছু ছিল একেবারে স্বাভাবিক। পরিবারের সঙ্গে গল্প, পরিচিতদের সঙ্গে আড্ডা। হাসিমুখেই কেটেছিল রাত। তারপর নিজের ঘরে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই রাত পেরিয়ে সকাল হতেই বদলে গেল সবকিছু। যে মানুষটিকে কয়েক ঘণ্টা আগেও স্বাভাবিক অবস্থায় দেখেছিলেন তাঁর আপনজনেরা। সকালে তাঁরই ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হল বাড়ি সংলগ্ন দলীয় কার্যালয় থেকে। রামপুরহাটের প্রবীণ তৃণমূল নেতা, পাঁচ বারের প্রাক্তন বিধায়ক, রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী এবং বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ঘিরে এখন একের পর এক প্রশ্ন উঠছে। কী এমন ঘটেছিল তাঁর জীবনে, যার পরিণতি এতটা মর্মান্তিক? সত্যিই কি তিনি আত্মঘাতী হয়েছেন? নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোনও কারণ? সেই উত্তরই এখন খুঁজছে পুলিশ।

রবিবার সকালে বীরভূমের রামপুরহাটের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাটতলাপাড়ায় নিজের বাড়ি সংলগ্ন দলীয় কার্যালয় থেকে উদ্ধার হয় আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলন্ত দেহ। খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থলে ভিড় জমে যায়। স্থানীয় মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী এবং পরিচিতরা ছুটে আসেন দলীয় কার্যালয়ের সামনে। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। রামপুরহাট থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। সেই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতে লেখা চিঠিও উদ্ধার হয়েছে বলে জানা যায়। চিঠিটিকে ঘিরেই এখন আরও বেড়েছে রহস্য। প্রাথমিক ভাবে পুলিশ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে অনুমান করছে। তদন্ত এবং ময়নাতদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না তদন্তকারীরা। কারণ, মৃত্যুর আগে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানসিক অবস্থা কেমন ছিল। শেষ কয়েক ঘণ্টায় তাঁর সঙ্গে কার কার যোগাযোগ হয়েছিল, উদ্ধার হওয়া চিঠিটি তাঁরই লেখা কি না এবং চিঠিতে লেখা কথাগুলির সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনও যোগ রয়েছে কি না। সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক পরিচয় কোনও ছোট পরিসরের ছিল না।

২০০১ রামপুরহাটের বিধায়ক হিসেবে রাজনৈতিক পথচলা শুরু
২০০১-২০২৬ টানা ৫ বার রামপুরহাটের বিধায়ক
তৃণমূল সরকারে স্কুলশিক্ষা ও কৃষি দফতরের মন্ত্রী
২০২১-২০২৬বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার
রাজনীতির পাশাপাশিদীর্ঘদিন শিক্ষকতা


২৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে একজন শিক্ষক থেকে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে মন্ত্রী, বিধায়ক এবং বিধানসভার গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে পৌঁছেছিলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু রাজনীতিই তাঁর পরিচয়ের একমাত্র জায়গা ছিল না। দীর্ঘদিন শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। স্থানীয় মানুষের কাছেও তাঁর পরিচয় ছিল একজন শিক্ষক এবং প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসময়ের দুর্দিনের সঙ্গী ছিলেন আশিস। তৃণমূলের শুরুর দিন থেকে দলে ছিলেন তিনি। তাই তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুতে শুধু তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরাই নন, শোকাহত স্থানীয় বাসিন্দারাও। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। রামপুরহাট কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী ধ্রুব সাহার কাছে পরাজিত হন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। পাঁচ বারের বিধায়ক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ জয়ের ধারায় ছেদ পড়ে। ২৪ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত হন তিনি। নির্বাচনের পর তাঁকে আগের মতো সক্রিয় রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছিল না। এরই মধ্যে দলীয় সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়ানোর ঘটনা সামনে আসে। ফলে রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্বে আশিসের অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছিল। আর এরই মধ্যে তাঁর মৃত্যুর খবর।

মৃত্যুর সঙ্গে উদ্ধার হওয়া চিঠিটিই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করছে। প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী, সেই চিঠিতে নিজের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে একাধিক কথা লিখেছেন আশিস।


“ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে কিন্তু দুর্নীতিতে জড়াননি। কোনও কাজের বিনিময়ে এক পয়সাও নেননি। রাজনৈতিক জীবনে নানা বাগ্‌বিতণ্ডা হলেও, তা কখনও ব্যক্তিগত শত্রুতার পর্যায়ে যায়নি। দলের কিছু অন্যায় মেনে নিতে না পারলেও
তিনি প্রতিবাদ করতে পারেননি। রাজনীতিতে আসাটাই ভুল হয়েছে ।”

এখানেই তৈরি হচ্ছে প্রশ্ন। কোন পরিস্থিতির কথা বলতে চেয়েছিলেন আশিস? কাদের কথা ভেবে তিনি এই মন্তব্য করেছিলেন? কেনই বা জীবনের শেষ সময়ে এসে রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে আক্ষেপের কথা লিখলেন? চিঠিতে তারাপীঠ-রামপুরহাট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অর্থাৎ টিআরডিএ-র দায়িত্ব নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন আশিস। সেখানে তাঁর দাবি, টিআরডিএতে জেনারেল মিটিং ছাড়া তাঁর তেমন কোনও ক্ষমতা ছিল না। টেন্ডার কমিটি, চেক পাশ, প্ল্যান পাস কিংবা নো অবজেকশন সার্টিফিকেট দেওয়ার মতো বিষয়ে তাঁর কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না বলেও তিনি লিখেছেন। তাঁকে হেয় বা অপমান করার চেষ্টা হয়েছিল বলেও চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে। আর সেই প্রসঙ্গেই এসেছে তাঁর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আক্ষেপ। রাজনীতিতে আসাটাই ভুল হয়েছে বলে মনে হয়েছিল তাঁর। এমনকি পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মকে রাজনীতিতে না আসার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। তবে চিঠিতে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করেছেন কি না, সেটাই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ চিঠিতে যেসব কথা লেখা হয়েছে, সেগুলির প্রকৃত প্রেক্ষাপট কী ছিল, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয়।

আশিস তাঁর শিক্ষকতার জীবন নিয়েও লিখেছেন বলে জানা যাচ্ছে। সারাজীবন শিক্ষকতা করেছেন, কোনও দিন ক্লাস ফাঁকি দেননি, বিশেষ ক্লাস নিয়েছেন এবং অনেক ছাত্রছাত্রীকে বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন এমন কথাও চিঠিতে রয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসার কথাও স্মরণ করেছেন তিনি। অর্থাৎ জীবনের শেষ লেখায় নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি শিক্ষকতার পরিচয়কেও সামনে রেখেছেন আশিস। এরপর পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন তিনি। তাঁদের শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। আর সবশেষে জানিয়েছেন, তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। এমন কথাও চিঠিতে রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু এখানেই আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। যদি মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করে থাকেন, তা হলে কেন নিজের রাজনৈতিক জীবন, অপমান, দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে এত কথা লিখলেন? তাঁর মানসিক অবস্থার সঙ্গে এই লেখাগুলির সম্পর্কই বা কতটা? তদন্তকারীদের কাছে এখন এই প্রশ্নগুলিই গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত্যুর আগের রাতের ঘটনাপ্রবাহ আরও একটি দিক সামনে আনছে। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, শনিবার রাত পর্যন্ত আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় স্বাভাবিক ছিলেন। পরিবারের লোকজনের সঙ্গে বসে গল্প করেছেন। তাঁর ভাইয়ের বক্তব্য, রাত প্রায় ১২টা পর্যন্ত তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন। এরপর আশিস নিজেই খেতে যান ও নিজের ঘরে চলে যান। তাঁর আচরণে এমন কোনও পরিবর্তন তাঁরা বুঝতে পারেননি। যা দেখে মনে হতে পারে যে তিনি কোনও চরম সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন।

এই জায়গাটিই পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে মানুষটি তাঁদের সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছিলেন, সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর তাঁরা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। স্থানীয় বাসিন্দারাও জানিয়েছেন, স্বাধীনতা দিবসের দিন আশিসকে স্বাভাবিক ভাবেই দেখা গিয়েছিল। দলীয় কার্যালয়ে ছিলেন তিনি, এলাকার মানুষের সঙ্গে কথাও বলেছেন। তাহলে রাতের পর এমন কী ঘটল? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে রাজনৈতিক মহলেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী থেকে শুরু করে বিরোধী দলের নেতারাও তাঁর মৃত্যুতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কালীঘাট তৃণমূলের নেতা কুণাল ঘোষ বলেছেন, সামাজিক কলঙ্কের ভয় মেনে নিতে পারলেন না। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।

অনুব্রত মণ্ডল তাঁকে শান্ত, নিরীহ এবং কোনও শত্রুতা না থাকা মানুষ হিসেবে স্মরণ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আশিস কোনও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে তিনি মনে করেন না। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আশিসকে পরাজিত করা বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহাও এই ঘটনাকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মৃত্যুর পিছনে পারিবারিক না রাজনৈতিক। কী কারণ রয়েছে, তা তদন্ত করে সামনে আনা প্রয়োজন।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যেও একই সুর। এমন একজন মানুষ হঠাৎ করে চলে যাবেন, তা তাঁরা কল্পনাও করতে পারেননি। বিরোধী দলের স্থানীয় নেতারাও আশিসের রাজনৈতিক সততা নিয়ে কথা বলেছেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিগত ভাবে তাঁর প্রতি যে শ্রদ্ধা ছিল। মৃত্যুর পর তাই যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘ ২৫ বছরের বিধায়ক-জীবন, রাজ্যের মন্ত্রীত্ব, বিধানসভার ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব, তারও আগে দীর্ঘ শিক্ষকতা। একজন মানুষের জীবনের এতগুলি পরিচয় একসঙ্গে জড়িয়ে ছিল আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তাঁর জীবনের শেষটা রামপুরহাটের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের আকস্মিক পরিসমাপ্তিও বটে।

কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে যে প্রশ্নগুলি উঠে এসেছে, সেগুলির উত্তর এখনও অধরা। রাত পর্যন্ত স্বাভাবিক থাকা একজন মানুষ কী ভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এমন পরিণতির দিকে গেলেন? উদ্ধার হওয়া চিঠিতে লেখা কথাগুলির নেপথ্যে ঠিক কী ছিল? তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কোনও চাপ, ব্যক্তিগত কোনও কারণ, নাকি সম্পূর্ণ অন্য কোনও ঘটনা। কোনটি লুকিয়ে রয়েছে এই মৃত্যুর পিছনে? এই রহস্যময় মৃত্যুর অন্ধকারের আড়ালে আসলে কোন সত্য লুকিয়ে ছিল। আর সেই সত্য সামনে আসার অপেক্ষাতেই এখন তাকিয়ে রামপুরহাট।