গুরুত্ব পাচ্ছে ডি-ডলারাইজেশন !

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চিন, যারা নিজেদের মুদ্রা ইউয়ানকে সামনে রেখে গড়ে তুলতে চাইছে এক নতুন আর্থিক কাঠামো।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : আজকের বিশ্ব অর্থনীতি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে এতদিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন প্রায় সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করত মার্কিন ডলারের উপর, সেখানে এখন ধীরে ধীরে উঠে আসছে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চিন, যারা নিজেদের মুদ্রা ইউয়ানকে সামনে রেখে গড়ে তুলতে চাইছে এক নতুন আর্থিক কাঠামো। এই প্রেক্ষাপটে “ডি-ডলারাইজেশন” শব্দটি ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে- যা শুধু একটি অর্থনৈতিক কৌশল নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতি ও শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

প্রথমেই বুঝে নেওয়া যাক- ডি-ডলারাইজেশন বলতে কী বোঝায়?
সহজ ভাষায়, বিশ্ব বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং রিজার্ভে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বিকল্প মুদ্রা, বিশেষ করে ইউয়ান বা অন্য দেশের মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোই হল ডি-ডলারাইজেশন। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারই প্রধান মুদ্রা। তেল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক লেনদেন- সবক্ষেত্রেই ডলারের আধিপত্য রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চিন এই আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করেছে।

চিনের এই কৌশলের অন্যতম বড় দিক হল- ইউয়ান-ভিত্তিক বাণিজ্য। চিন ইতিমধ্যেই রাশিয়া, ব্রাজিল এবং সৌদি আরবের মতো দেশের সঙ্গে ইউয়ানে লেনদেন বাড়িয়েছে। বর্তমানে চিনের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ ইউয়ানে সম্পন্ন হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। এর ফলে ডলারের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমছে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ- মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ কমানো। চিন একসময় মার্কিন সরকারের অন্যতম বড় ঋণদাতা ছিল। কিন্তু এখন তারা ধীরে ধীরে তাদের ইউএস ট্রেজারি হোল্ডিং কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে মার্কিন অর্থনীতির ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে বেইজিং।

তৃতীয় দিক- বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা BRI। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চিন বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ঋণ দিচ্ছে, এবং সেই ঋণ অনেক ক্ষেত্রেই ইউয়ানে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ছে এবং একটি বিকল্প অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে।

চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ দিক- সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক ডাইভার্সিফিকেশন। চিন এবং ব্রিকস দেশগুলি তাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে ডলারের অংশ কমিয়ে সোনা এবং অন্যান্য সম্পদের দিকে ঝুঁকছে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, যা ভবিষ্যতে ডলারের আধিপত্য কমাতে সাহায্য করতে পারে।

এখন প্রশ্ন- এই পদক্ষেপগুলোর প্রভাব কী?

প্রথমত, ডলারের আধিপত্যে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে পারে।
যদিও এখনো ডলার বিশ্ব রিজার্ভ মুদ্রার প্রায় ৬০ শতাংশ দখল করে আছে, ইউয়ানের অংশ এখনো মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু ট্রেন্ড বলছে, ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ছে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।
যদি আরও দেশ ইউয়ান বা অন্যান্য মুদ্রায় লেনদেন শুরু করে, তাহলে একটি মাল্টি-পোলার কারেন্সি সিস্টেম তৈরি হতে পারে, যেখানে একাধিক মুদ্রা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তৃতীয়ত, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমানোর চেষ্টা।
ডলার-ভিত্তিক লেনদেনের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহজেই অন্য দেশগুলির ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। চিন এই ঝুঁকি কমাতেই বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করছে।


তবে এই পথ একেবারেই সহজ নয়
চিনের ইউয়ান এখনও পুরোপুরি মুক্ত মুদ্রা নয়
চিনে কঠোর ক্যাপিটাল কন্ট্রোল রয়েছে
অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সহজে টাকা ঢোকাতে বা বের করতে পারেন না
এছাড়া স্বচ্ছতার অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ

এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক আস্থার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ডলার দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থিতিশীল এবং বিশ্বাসযোগ্য মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ইউয়ানকে সেই জায়গায় পৌঁছাতে সময় লাগবে।

এখন প্রশ্ন—ভারতের মতো দেশের ওপর এর প্রভাব কী হতে পারে?

ভারত ইতিমধ্যেই কিছু ক্ষেত্রে রুপি-ভিত্তিক বাণিজ্য শুরু করেছে। যদি বিশ্ব বাণিজ্যে একাধিক মুদ্রার ব্যবহার বাড়ে, তাহলে ভারতের মতো দেশগুলিও ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ পেতে পারে। তবে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ বৈদেশিক বাণিজ্য ও মুদ্রানীতি অত্যন্ত জটিল বিষয়। একটি মুদ্রা থেকে অন্য মুদ্রায় পরিবর্তন সহজ নয় এবং এতে অর্থনৈতিক ঝুঁকিও থাকতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, চিনের ডি-ডলারাইজেশন কৌশল একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এটি রাতারাতি ডলারের আধিপত্য ভেঙে ফেলবে না, কিন্তু ধীরে ধীরে একটি নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে বিশ্বকে নিয়ে যেতে পারে। বিশ্ব কি তবে একমেরু ডলার নির্ভরতা থেকে বহু-মুদ্রার যুগে প্রবেশ করতে চলেছে? এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট- আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চীন ও তার ইউয়ান কৌশল।