দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের পর আচমকা মহাকাল মন্দিরেও যাওয়ার ইচ্ছে কেন দিলীপের? নিজের মত গেমপ্ল্যান সাজাচ্ছেন দিলীপ ? নিশ্চুপে ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে তৃণমূলের সঙ্গে?

বিশ্বজিৎ পাল, নিজস্ব সংবাদদাতা: দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপিতে আগের মত দাপট আর নেই দিলীপ ঘোষের। একাধিক ইস্যুতে ক্রমশ দলের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে তার। হারিয়েছেন পদ, হারিয়েছেন গুরুত্ব। একের পর এক সভায় তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি ডাকা হয়নি বৈঠকেও। স্থান দেওয়া হয়নি কমিটিতেও। কিন্তু প্রতিদিন মর্নিং ওয়াকে গিয়ে তিনি বিজেপিতেই আছেন বললেও একের পর এক এমন বক্তব্য রেখেছেন যাতে করে জল্পনা বেড়েছে। কীসের জল্পনা? দিলীপের ফুলবদলের। মাঝেমধ্যেই ইতিউতি খবর ভেসে আসত তলায় তলায় তৃণমূলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছেন দিলীপ। যে কোন দিন তিনি বিজেপি ছাড়বেন। জল্পনা চরমে ওঠে সেইদিন যেইদিন একেবারে সস্ত্রীক দিলীপ ঘোষ হাজির হন দিঘার জগন্নাথ ধামে, না যে কোন দিন তো তিনি যাননি, যখন মুখ্যমন্ত্রী সেখানে স্বয়ং রয়েছেন আছ্বেন অন্যান্য নেতা মন্ত্রীরাও ঠিক সেই সময়েই সেদিন রাজ্য রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত খবর তৈরি করেছিলেন তিনি, কেউ আন্দাজও করতে পারেননি রাজ্য সরকারের আমন্ত্রণকে সম্মান জানিয়ে দিঘার জগন্নাথধামে চলে যাবেন বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার কিছুক্ষণ আগেই দিঘার জগন্নাথধামের দ্বারোদ্ঘাটন করেছেন, সেদিন দিলীপ পৌঁছতেই বিরল রাজনৈতিক সৌজন্যের ছবিও তৈরি হয়েছিল দিঘায়। জগন্নাথধাম চত্বরে উত্তরীয় পরিয়ে সস্ত্রীক দিলীপকে বরণ করেছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। আর মন্দির দর্শন শেষ হওয়ার পর পাশাপাশি বসে গল্পগুজব করতে দেখা গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী এবং দিলীপকে। জগন্নাথধাম উদ্বোধনের অনুষ্ঠান বয়কট করে সেদিনই কাঁথিতে পাল্টা কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। সেই কাঁথি পেরিয়েই দিঘা গেলেন দিলীপ। তবে শুভেন্দুর ‘সনাতনী সমাবেশে’ গেলেন না। কাঁথিতে কেন গেলেন না? দিলীপ বলেছিলেন, ‘‘আমাকে তো সেখানে কেউ আমন্ত্রণ জানাননি। দিঘায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাই গিয়েছি।’’
দিলীপের যুক্তি, ‘‘অক্ষয় তৃতীয়ায় এ রকম অজস্র অনুষ্ঠান হচ্ছে। সব জায়গায় যাচ্ছি নাকি? যেখানে যেখানে আমন্ত্রণ পেয়েছি, সেখানেই যাচ্ছি।’’বলাই বাহুল্য এই ছবি বিজেপির অস্বস্তি বাড়িয়েছিল এরপর দূরত্ব আরও বাড়ল। ঠিক তার পরেই ছিল ২১ জুলাই, শোনা গেল ওইদিন মঞ্চে দেখা যেতে পারে দিলীপ ঘোষকে! জল্পনা উস্কে দিলীপও তো বলেছিলেন ২১ তারিখ নতুন চমক আসবে এবং সারা বাংলা দেখবে। দাবি করতে অসুবিধা কী। স্বপ্ন দেখুক সবাই। কিন্তু দেখা গিয়েছিল খড়গপুরে বিজেপি’র খুন হওয়া কর্মীদের স্মরণে ‘শহিদ শ্রদ্ধাঞ্জলি সভা’য় ছিলেন দিলীপ, এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। রাজ্যে একাধিকবার মোদী শাহ এলেও আমন্ত্রণ ভাগ্য হয়নি দিলীপের। তবে সমস্ত হিসেব বদলে যায় ডিসেম্বরের শেষে। রাজ্যে এলেন অমিত শাহ, অন্যান্য বিজেপি নেতাদের সঙ্গে শাহি বৈঠকে ডাক পেলেন দিলীপ ঘোষও,শাহের বৈঠকে দিলীপকে নিজে আমন্ত্রণ জানান কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল। পোড়খাওয়া দিলীপের বুঝতে অসুবিধা হয়নি, এ বার সক্রিয়তায় ফেরার সময় এসে গিয়েছে। গত কয়েক বছরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন যে বিজেপি কর্মীরা, তাঁদের মধ্যেও উদ্দীপনা তৈরি হয়ে গিয়েছে। অনেকেই সেই সময় বললেন দিলীপের রাজনৈতিক কেরিয়ারের শীতঘুম অবশেষে ভাঙল। সেদিন মিনিট দশেক অমিত শাহের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছিল দিলীপ ঘোষের। সেখানেই তাঁকে নতুন করে মাঠে নামতে বলা হয়, রাজ্য বিজেপির সভাপতি থাকার সময়ে মাঠে-ময়দানে দাপট দেখিয়েছিলেন দিলীপ ঘোষ, ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত রাজ্য বিজেপির সভাপতি পদে ছিলেন দিলীপ ঘোষ। সেই সময়েই ভোট বেড়েছে বিজেপির। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৭৭টি আসন জিতে রাজ্যের বিরোধী আসনে বসে বিজেপি। যা এ রাজ্যে এখনও পর্যন্ত বিজেপির সবচেয়ে ভালো নির্বাচনী রেকর্ড। এরকম এক মানুষকে ভোটের আগে ডিঅ্যাক্টিভেট করে রাখার মতো বোকামো বিজেপি করত না। অবশেষে দায়িত্ব পেলেন দিলীপ পরের দিন থেকেই চেনা ময়দানে চেনারূপে দৌড় শুরু। ফের শুরু মমতা অভিষেককে আক্রমণ। তবে এতদিনের যে জল্পনা তিনি নাকি গেরুয়া রংটাকে আর ভালোবাসছেন না তার কি হল? আপনারা জানেন মাটিগাড়ায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যেয়র হাত ধরে বহু প্রতীক্ষিত মহাকাল মন্দিরের শিলান্যাস এই মুহূর্তে রাজ্য রাজনীতির হাই ভোল্টেজ খবর। এটিই হতে চলেছে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় মহাকাল মন্দির। আর সেই মন্দিরেই যাওয়ার ইচ্ছেপ্রকাশ করলেন দিলীপ ঘোষ, আবার শুরু হল জল্পনা তাহলে বিজেপির সঙ্গে মন কষাকোষি মেটেনি দিলীপের? না হলে যে মন্দিরে লেগে আছে মুখ্যমন্ত্রী হাত দিঘার পর এরকম কোন স্থানে দিলীপ কেন যেতে চাইবেন? শুক্রবার সকালে দিলীপ তো সাফ জানালেন মন্দিরে সকলে যেতে পারেন। আমিও যাব মহাকাল মন্দিরে, তাঁর কথায়, “মন্দির কে করল, কোন দল করল সেটা কোনও বড় কথা নয়। মানুষ ভালো-খারাপ হতেই পারে। তার সঙ্গে মন্দিরের কোনও সম্পর্ক নেই। যে বক্তব্য শুনে অনেকেই বলছেন তাহলে ফের শুরু ফুলবদলের জল্পনা?
একদিকে যেমন সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসাও করেননি আবার নিজের রহস্যময় স্ট্যান্ড পয়েন্ট বজায় রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি আবার দক্ষিণ দমদমে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভবনের উদ্বোধনে এসে তো সরাসরি মমতাকেই আক্রমণ করলেন দিলীপ ঘোষ। তাঁর মুখে শোনা গেল সেই সবুজ ফাইল প্রসঙ্গ।
অর্থাৎ একদিকে তিনি মহাকাল মন্দিরে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করছেন আবার একই মুহূর্তে কটাক্ষ করতে ছাড়ছেন না মুখ্যমন্ত্রীকে। দিলীপ ঘোষের এই বক্তব্য থেকে ফের যে কানাঘুষো শুরু হল তা স্পষ্ট। সে তিনি যতই দোহাই দিন তিনি সমস্ত মন্দিরেই যান, কিন্তু রাজনীতি হল এমন এক পাশা, যা যখন খুশি উল্টে যেতে পারে। আর তাই দিলীপও যে ধীরে ধীরে বেসুরো বাজছেন না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। হতেও পারে তিনি এই মুহূর্তে জল মাপছেন। তাই একেবারে সাবধানে পা ফেলছেন দুই নৌকাকেই সামলে নিয়ে চলছেন। এভাবেই হয়তো একদিন ফের শিরোনামে আসবেন দিলীপ ঘোষের দলবদলের খবর। সমস্ত উত্তর দেবে সময়।