অনিশ্চয়তার মধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে নিঃশব্দে বয়ে চলেছে এক ভরসার স্রোত, ডিজেল। যার নাম মৈত্রী পাইপলাইন।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : যুদ্ধ কখনও শুধু সীমান্তে আটকে থাকে না। তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে বাজারে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা ঠিক সেইভাবেই আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতিতে। ঢাকার ফিলিং স্টেশনগুলোয় গাড়ির অন্তহীন লাইন, চোখে উৎকণ্ঠা আর মুখে একটাই প্রশ্ন,আজ কি তেল পাওয়া যাবে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে নিঃশব্দে বয়ে চলেছে এক ভরসার স্রোত, ডিজেল। যার নাম মৈত্রী পাইপলাইন। নরেন্দ্র মোদী ও শেষ হাসিনার উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই পাইপলাইন আজ শুধু একটি প্রকল্প নয় বরং সংকটের সময়ে নির্ভরতার আরেক নাম। শিলিগুড়ি থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এই জ্বালানি সেতু ভারতের মাটি থেকে সরাসরি বাংলাদেশের ভেতরে পৌঁছে দিচ্ছে ডিজেল। কিছু দিন আগেই খাদ্যশস্য পাঠিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারত। আর এবার জ্বালানি দিয়ে সেই সহায়তাকে আরও বাস্তব ও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। ফলে যে চাপ হঠাৎ করে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার উপর তৈরি হয়েছিল তার বড় অংশটাই সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে এই সরবরাহের মাধ্যমে।

কিন্তু দেশের অভ্যন্তরের চিত্র এখনও পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন তথা বিপিসির নিয়ন্ত্রণে তেল আমদানি ও সরবরাহ চললেও, অস্বাভাবিক চাহিদা পুরো ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণত যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার টন ডিজেলের প্রয়োজন হয় সেখানে আতঙ্কে সেই চাহিদা একসময় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে রেশনিং চালু করা হয়, পরে তা তুলে নেওয়া হলেও মানুষের মনে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। ফলে ফিলিং স্টেশনে তেল পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই তা দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। যে সরবরাহের চেয়ে চাহিদার গতি অনেক বেশি। এই বাড়তি চাপের পেছনে রয়েছে অস্থিরতা। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের উত্থান, বিমান খরচ বৃদ্ধি সব মিলিয়ে দ্রুত তেল আমদানি করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের বিভিন্ন ডিপো থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল ছাড়া হলেও প্রায় আড়াই হাজার ফিলিং স্টেশনে সেই সরবরাহ সমানভাবে পৌঁছে দেওয়া সহজ নয়। কৃষিক্ষেত্রে সেচ, শিল্পে উৎপাদন সবই নির্ভর করছে ডিজেলের ওপর, ফলে সংকটের অভিঘাত পড়ছে সর্বত্র।
ইস্টান রিফাইনারি লিমিটেট চট্টগ্রামে অবস্থিত বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার। যা মজুত রয়েছে তা থেকে চলবে ২০ থেকে ২২ দিন। এই অবস্থায় চিন, আমেরিকা ও ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বাংলাদেশ। আবেদনে সাড়া দিয়ে ১০ হাজার টন ডিজেল পাঠিয়েছে ভারত। ২০০৭ অসমে নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড থেকে বাংলাদেশে তেল পাঠানো শুরু করে ভারত। জলপথ, রেল এবং পরে ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনের মধ্যে দিয়ে তেল আমদানি করে বাংলাদেশ। ১৩২ কিলোমিটার পাইপলাইন। অসম থেকে প্রথমে পশ্চিমবঙ্গে তারপর শিলিগুড়ি থেকে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পৌঁছয়। ২০১৭ নরেন্দ্র মোদী ও শেখ হাসিনার সঙ্গে চুক্তি ২ হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে প্রতি বছর ১ লক্ষ ৮০ হাজার টন ডিজেলের কেনা বেচা। ছয় মাসের মধ্যে ৯০ লক্ষ টন ডিজেল দিতে হবে ভারতকে। সেই চুক্তির অংশ হিসেবেই বাংলাদেশকে ডিজেল দিল ভারত। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই বাংলাদেশকে সচল রাখতে এই পদক্ষেপ। শুধু বাংলাদেশেই নয় পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশ। জ্বালানি সংরক্ষনে স্কুল বন্ধ পাকিস্তানে। ৫০ শতাংশ কর্মীদের ওয়ার্ক ফ্রম হোম। এখন সেফ চার দিন কাজ। কার্যত বলাই যায় সেখানে লকডাউনের পরিস্থিতি। জ্বালানি সংরক্ষনের কারণ দেখিয়েও পদ্মপারেও একই অবস্থা।

এই বাস্তবতার মাঝেই রাজনৈতিক অঙ্গনেও তরজা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের নয়া প্রধামন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে নতুন করে জল্পনা। এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই বলছেন, একদিকে ভারতের এই জ্বালানি সহায়তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে সচল রাখতে সাহায্য করছে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের টানাপোড়েন ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এর আগেও ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতার একাধিক নজির রয়েছে। বিদ্যুৎ রপ্তানি, গ্যাস সংযোগ ও অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্যমে দুই দেশ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মৈত্রী পাইপলাইন শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়, এটি কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি সফল উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়। ফলে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাঝেও এই ধরনের প্রকল্প দুই দেশের সম্পর্ককে দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ডিজেল দিয়ে সাহায্য ভারতের। নতুন সরকার গঠন হয়েছে বাংলাদেশে। নয়া প্রধানমন্ত্রী বিএনপির নেতা তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হয়েই তাঁর সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতেই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক করার চেষ্টাও করছে বাংলাদেশ। এখানেই প্রশ্ন উঠছে হাসিনাই সচল রাখছেন তারকে রহমানের বাংলাদেশকে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আঁচ তার পাশাপাশি শীতল হচ্ছে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক। শেখ হাসিনার সময়ে তৈরি হওয়া সেই সংযোগ আজ যেন এক দাঁড়িয়ে বর্তমান বাস্তবতা। আর তারেক রহমানকে নিয়ে যতই রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টি হোক না কেন ভারতই জ্বালানি জোগাচ্ছে বাংলাদেশকে।