দিল্লির মাটি থেকে হাসিনার ঘোষণায় জল্পনা তুঙ্গে!

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : দিল্লির মাটি থেকে একটা ঘোষণা। আর সেই ঘোষণাকে কেন্দ্র করেই ফের উত্তপ্ত বাংলাদেশের রাজনীতি। শেখ হাসিনা জানিয়ে দিয়েছেন- ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরতে চান তিনি। কিন্তু এই ঘোষণা কি শুধুই একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ইচ্ছা? নাকি এর পিছনে রয়েছে বড় কোনও রাজনৈতিক কৌশল? কারণ শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা আওয়ামী লীগ কি ডিসেম্বরকে সামনে রেখে ফের সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে? বাংলাদেশের বিভিন্ন সূত্র এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তেমনই দাবি উঠছে। আর সেই কারণেই বাংলাদেশের পাশাপাশি নজর এখন ভারতের দিকেও। কারণ শেখ হাসিনা গত প্রায় দু’বছর ধরে ভারতেই রয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসেন তিনি। এবার দিল্লির মাটি থেকেই জানালেন- ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও সামনে এনেছেন তিনি। অর্থাৎ ডিসেম্বর এখন শুধু ‘শেখ হাসিনার দেশে ফেরার মাস’ নয়। আওয়ামী লীগের কাছে এটি হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক অস্তিত্ব পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা।
তাহলে কী করছে আওয়ামী লীগ?
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। ফলে প্রকাশ্যে দলীয় কর্মসূচি করা কার্যত অসম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিক দল মানে শুধু মিছিল-মিটিং নয়। সংগঠন টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ে উপস্থিতি ধরে রাখা। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ এখন সেই কাজটাই করার চেষ্টা করছে। কেউ আত্মগোপনে। কেউ দেশের বাইরে। আর মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মী স্থানীয়ভাবে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন। গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঝটিকা মিছিলের খবরও সামনে এসেছে। তবে এসব ঘটনার সবকটির সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সরাসরি নির্দেশের যোগসূত্র স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর একটি উদ্দেশ্য হতে পারে কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা। কারণ প্রায় দু’বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় সংগঠনের ভেঙে পড়া। আর সেখানেই ডিসেম্বরের ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ।
ডিসেম্বর কি আসলে একটি ‘ডেডলাইন’?
শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরতে চান। কিন্তু আওয়ামী লীগের জন্য ডিসেম্বরের গুরুত্ব আরও গভীর হতে পারে। বাংলাদেশের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরের সময়সীমা প্রতীকীও হতে পারে- এর মাধ্যমে দলীয় কর্মীদের চাঙা রাখা, আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা এবং হারানো রাজনৈতিক জায়গা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হতে পারে। অর্থাৎ, দেশে এখনই ক্ষমতায় ফিরে আসা সম্ভব না হলেও- ‘আওয়ামী লীগ শেষ হয়ে যায়নি’- এই বার্তাটাই সংগঠনের ভিতরে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। এখানে শেখ হাসিনার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আওয়ামী লীগের কাছে শেখ হাসিনা শুধু প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নন। তিনি দলের দীর্ঘদিনের সভাপতি এবং দলের সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তাই তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণা কর্মীদের কাছে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও কাজ করতে পারে।
আর এখানেই ভারতের ভূমিকা শেখ হাসিনা যখন দিল্লিতে বসে দেশে ফেরার ঘোষণা করছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে- ভারত কি তাঁকে বাংলাদেশে ফেরার সুযোগ দেবে? বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই তাঁকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে আবেদন করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা রয়েছে এবং আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। ফলে তাঁর প্রত্যাবর্তন এখন শুধুই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইনি এবং কূটনৈতিক প্রশ্নও। ভারতের পক্ষ থেকে অবশ্য শেখ হাসিনার দিল্লির বক্তব্যকে সরকারি বক্তব্য হিসেবে দেখানো হয়নি। দিল্লির অবস্থান হল- তিনি যে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি ছিল একটি বেসরকারি অনুষ্ঠান এবং ভারত সরকার তার সঙ্গে যুক্ত ছিল না। অর্থাৎ ভারত একদিকে তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের দায়ও নিজের কাঁধে নিতে চাইছে না।
কিন্তু আওয়ামী লীগের জন্য সমস্যা আরও বড়। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেই কি আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারবে? উত্তর- এতটা সহজ নয়। কারণ দলের বিরুদ্ধে রয়েছে ২০২৪ সালের আন্দোলন ও দমন-পীড়নকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। অনেক নেতা-কর্মী মামলার মুখে। আর সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক মনোভাবও আওয়ামী লীগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। ফলে শুধু শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেন বলেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসন হয়ে যাবে- এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং ডিসেম্বরের আগে আওয়ামী লীগের সামনে তিনটি বড় কাজ থাকতে পারে। প্রথমত, সংগঠনকে টিকিয়ে রাখা। দ্বিতীয়ত, কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে আবার নিজেদের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করা। আর এই তৃতীয় কাজটাই সবচেয়ে কঠিন।
মাঠে ঝটিকা মিছিল, অনলাইন যোগাযোগ- কী বার্তা?
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন জেলার কিছু নেতা-কর্মী বিদেশে থাকা শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে যোগাযোগের অভিযোগও উঠেছে। আবার কোথাও কোথাও ছোট আকারের মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে খবর। তবে এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার- এই সমস্ত দাবির সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই এগুলিকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ওঠা দাবি হিসেবেই দেখা উচিত। তবে রাজনৈতিক দিক থেকে এর গুরুত্ব রয়েছে। কারণ একটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কাছে প্রকাশ্যে বড় সমাবেশ করার সুযোগ না থাকলে ছোট ছোট কর্মসূচি দিয়েই নিজেদের সংগঠন কতটা সক্রিয়, সেটা বোঝানোর চেষ্টা হতে পারে।
আর ভারতের জন্য এর অর্থ কী?
ভারতের সীমান্তের ওপারে যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে, তার প্রভাব এ দেশেও পড়তে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা-সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা এবং সীমান্ত পরিস্থিতি দিল্লির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার উপর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে ইতিমধ্যেই নানা বিষয়ে চাপ রয়েছে। বাণিজ্য, সীমান্ত, জলবণ্টন, নিরাপত্তা- প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের সম্পর্কের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। তাই শেখ হাসিনা ইস্যুতে দিল্লির সামনে এখন কঠিন ভারসাম্য। একদিকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখা। অন্যদিকে ভারতে থাকা শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। আর তৃতীয় দিকে- বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক গতিবিধির সম্ভাব্য প্রভাব সামলানো।
তাহলে ডিসেম্বরের আসল লড়াইটা কোথায়?
সম্ভবত শুধু ঢাকার রাস্তায় নয়। লড়াইটা হতে পারে রাজনৈতিক বয়ানের। আওয়ামী লীগ যদি বলতে পারে- ‘আমরা এখনও আছি, আমরা ফিরে আসব’- তাহলে কর্মীদের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হতে পারে। আর বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক শক্তিগুলির লক্ষ্য হতে পারে- আওয়ামী লীগকে যাতে ফের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ না দেওয়া হয়। এই দুই বিপরীত অবস্থানের মাঝখানেই ডিসেম্বরের রাজনীতি তৈরি হচ্ছে। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন তাই একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক ট্রিগার। তিনি দেশে ফিরলে সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস তৈরি হতে পারে। বিরোধীদের মধ্যে পাল্টা প্রতিক্রিয়াও তৈরি হতে পারে। আর যদি তিনি শেষ পর্যন্ত ফিরতে না পারেন, তাহলেও ডিসেম্বরের ঘোষণা আওয়ামী লীগের কর্মীদের সংগঠিত রাখার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।
দুই বছর আগে যে দল বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল, আজ সেই দল নিষিদ্ধ। তার শীর্ষ নেতা ভারতে। সেই নেতা এখন বলছেন- তিনি ডিসেম্বরেই দেশে ফিরবেন। সেই ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাই ডিসেম্বরকে শুধু শেখ হাসিনার ‘হোমকামিং’ হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো ছবিটা দেখা হবে না। এটি হতে পারে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দেওয়ার মাস। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জোরালো করার মাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানে হারানো জায়গা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা শুরুর মাস। আর এই গোটা প্রক্রিয়ার দিকে নজর দিল্লিরও। কারণ প্রশ্নটা এখন শুধু- শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরবেন কি না- তা নয়। প্রশ্ন আরও বড়। শেখ হাসিনা ফিরলে আওয়ামী লীগও কি ফিরতে পারবে? আর সেই প্রত্যাবর্তনের পথে ভারত কী ভূমিকা নেবে? উত্তরটা হয়তো পাওয়া যাবে ডিসেম্বরেই।