পশ্চিম এশিয়ায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আবারও সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে আমেরিকা ও ইরান।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : পশ্চিম এশিয়ায় ফের যুদ্ধের দামামা। বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও অস্থিরতার ছায়া ঘনিয়ে এসেছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে সমঝোতা যুদ্ধবিরতির আশার আলো দেখিয়েছিল সেই আলো এখন প্রায় নিভে গেছে। পশ্চিম এশিয়ায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আবারও সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে আমেরিকা ও ইরান। দুই দেশের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপে গোটা অঞ্চলজুড়ে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলও পরিস্থিতির দিকে গভীর উদ্বেগ নিয়ে নজর রাখছে।
বুধবার ভোরে মার্কিন সেনার সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের হরমুজ উপকূলবর্তী সামরিক ঘাঁটি, রাডার ব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্রগুলিকে লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। প্রথম দফার হামলা প্রায় ৯০ মিনিট ধরে চলে। এর প্রায় ৯ ঘণ্টা পরে দ্বিতীয় দফায় আবারও হামলা চালানো হয়। মার্কিন বাহিনীর দাবি, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য় ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করা এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই অভিযানে মূল নিশানা ছিল হরমুজ প্রণালীর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রেটার টুনব দ্বীপ। ১৯৭১ সাল থেকে দ্বীপটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেন্টকমের দাবি, সেখানে থাকা রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংস হওয়ায় হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সামরিক কার্যকলাপ উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে ইরানের আহবাজ শহর সংলগ্ন এলাকাতেও হামলা চালানো হয়। এই হামলায় ঠিক কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা কতজন হতাহত হয়েছেন সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
মার্কিন হামলার পরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ইরান। আমেরিকার সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম মুখ মহম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, আমরা আমেরিকার বিরুদ্ধে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। একই সঙ্গে ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর দাবি করেছে, তারা বাহরিন, কুয়েত এবং জর্ডনে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন হামলার পর দেশের একাধিক এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সংবাদসংস্থা ‘মেহর’-এর দাবি, বন্দর আব্বাসের কাছে মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছে। এছাড়া চাবাহার বন্দরের কাছেও পরপর তিনটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।

এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার ঘটনা। গত ১৭ জুন আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সংঘর্ষ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে ইরান হরমুজ় প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজগুলির উপর হামলা অব্যাহত রাখে। এরপরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ইতি ঘোষণা করেন যদিও আলোচনার দরজা এখনও পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে জানিয়েছেন, ইরান যদি শান্তি আলোচনায় ফিরে না আসে তাহলে আগামী সপ্তাহে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর উপর আরও বড় ধরনের হামলা চালানো হবে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহে তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আমরা তাদের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করে দেব। যদি তারা আলোচনার টেবিলে না আসে। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, গ্রেটার টুনব দ্বীপে বিমান হামলার ফলে হরমুজ় প্রণালীতে ইরানের সামরিক প্রভাব অনেকটাই কমে এসেছে। একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলির উপর মার্কিন নৌ-অবরোধও চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
অন্যদিকে, তেহরানের দাবি দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের ইরানশাহর শহরের কাছে একটি সেনাশিবিরে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সাতজন সেনা নিহত হয়েছেন। ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমে মোহাজেরান জানিয়েছেন, দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলায় ৩৫ জনেরও বেশি সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহতের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে বলে ইরানের স্বাস্থ্য দফতর দাবি করেছে। নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিস পাঠিয়েছে। যদিও এর আগে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করতে কংগ্রেসের দুই কক্ষে ‘ওয়ার পাওয়ার্স’ সংক্রান্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। নতুন সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট সেনেটর অ্যাডাম শিফ আবারও ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন’ উত্থাপন করেছেন যাতে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনা না করা যায়।
পশ্চিম এশিয়ার এই নতুন সংঘাত শুধু আমেরিকা ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার উপর। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণের পথ হরমুজ় প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা যত বাড়বে, ততই বাড়বে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা। এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর একটাই পরিস্থিতি কি আবার কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে শান্ত হবে নাকি এই সংঘাত আরও বড় আকারের যুদ্ধে রূপ নেবে। তার উত্তরই দেবে সময়ই।