আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধ পরিস্থিতির আবহেই এবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিল ইরান। জ্বালানি অর্থনীতিবিদরা কী বলছেন ?

মাম্পি রায়, সাংবাদিক: আমেরিকা ইজরায়েলের আক্রমণে ইরানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর থেকেই উত্তাল মধ্যপ্রাচ্য। পাল্টা দুবাই সহ মধ্যপ্রাচ্যের ১৫টি দেশকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান। প্রতিশোধের আগুন নেভার নয়। আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধ পরিস্থিতির আবহেই এবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিল ইরান। ফলে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সরু প্রণালী দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ তেল সরবরাহ। এখান দিয়েই গোটা বিশ্বে রফতানিযোগ্য তেলের ২০ শতাংশ তেল যায়।
এহেন হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কারের যাতায়াত আচমকা থমকে যাওয়াকে আপাতদৃষ্টিতে স্রেফ যুদ্ধকালীন বিপর্যয় মনে হতে পারে। কিন্তু জ্বালানি অর্থনীতিবিদ আনাস আলহাজ্জির মতে, ঘটনাটি শুধু সামরিক উত্তেজনার ফল নয়—এটি বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ভিতরে তৈরি একটি ধাক্কার প্রতিফলন। যা মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে ওয়াশিংটনের পুরনো কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরকে বিশ্বের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছে যে সরু জলপথ, তা হল হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz). বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই যায়। ফলে এই রুটে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
আলহাজ্জির দাবি, এ বার সরাসরি ইরানের হামলা নয়, বরং ‘নৌবিমা-ধাক্কা’ই পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। ইউরোপ ও বিশ্বের কয়েকটি বড় নৌবিমা সংস্থা হঠাৎ করে যুদ্ধঝুঁকির কভারেজ প্রত্যাহার করেছে বা প্রিমিয়াম এতটাই বাড়িয়ে দিয়েছে যে বহু জাহাজ মালিক কার্যত যাত্রা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর কথায়, “এমন পরিস্থিতি আগে কখনও তৈরি হয়নি। একাধিক জ্বালানি ও পণ্যবাজারকে গ্রাস করেছে অনিশ্চয়তার অন্ধকার।”
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তেলের উচ্চমূল্য নিয়ে যিনি প্রায়ই সরব হন, সেই ট্রাম্প এই বিমা সঙ্কট নিয়ে প্রকাশ্যে তেমন মন্তব্য করেননি। যদিও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরিস্থিতি অবনতি হলে মার্কিন নৌবাহিনী ট্যাঙ্কারগুলিকে নিরাপত্তা দিয়ে হরমুজ পেরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। যেমনটি ১৯৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নৌ-এসকর্ট নিরাপত্তা বাড়ালেও পরিবহণ খরচ, বিমা প্রিমিয়াম এবং বিলম্ব—সব মিলিয়ে উপসাগরীয় তেল ও গ্যাসের দাম বাড়বে। তাতে তুলনামূলকভাবে মার্কিন তেল ও এলএনজি (Liquefied Natural Gas) রফতানির প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান মজবুত হতে পারে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে ভারতেও। দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সার আমদানি হরমুজ হয়ে আসে। উপসাগরীয় গ্যাস ও তেলের উপর নির্ভরশীল সার শিল্পে ইতিমধ্যেই গ্যাস ব্যবহারে কাটছাঁটের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বপন মরসুমের মুখে এই সঙ্কট কৃষি উৎপাদন ধাক্কা খেতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে কৃষিপণ্য আমদানির প্রয়োজন বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক স্বার্থের মিল রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে দ্রুত। সিটিগ্রুপের পূর্বাভাস, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এলে ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে থাকতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাক্সের হিসাব, বর্তমান দামের মধ্যে প্রায় ১৮ ডলারের ‘ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি প্রিমিয়াম’ যুক্ত রয়েছে। তবে হরমুজ দিয়ে তেল চলাচল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে দাম ১০০ ডলার ছুঁতে পারে বলে সতর্ক করছে উড ম্যাকেঞ্জি।
আলহাজ্জির সতর্কবার্তা আরও গভীর। তাঁর মতে, এই বিমা সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বিশ্ব বাণিজ্যের ধারা বদলে যেতে পারে। অর্থনৈতিক অভিঘাত রাজনৈতিক অস্থিরতাও ডেকে আনতে পারে। তাঁর কথায়, “পরিবর্তন ঘটতে পারে—তবে যেখানে সবাই ভাবছে, সেখানে নয়।”