ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স হ্যান্ডেল, যেখানে আগে মানুষ নিজের প্রতিদিনের মুহূর্ত ভাগ করে নিত, আজ সেখানে নেমে এসেছে এক অদ্ভূত নীরবতা

সূচনা পল্যে, নিজস্ব সংবাদদাতা: সোশ্যাল মিডিয়া। এক সময় যা ছিল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আজ যেন তার থেকেই আজকের প্রজন্ম মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার। এই নতুন ট্রেন্ডের নাম- ‘Posting Zero’। কিন্তু হঠাৎ এমনটা কেন হচ্ছে? কারা সরে আসছেন? আর এর প্রভাব কী হতে পারে ভবিষ্যতে?
পরিসংখ্যান কী বলছে?
সম্প্রতি লন্ডনভিত্তিক বিখ্যাত দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমস সমীক্ষা চালায়। ৫০টি দেশ থেকে প্রায় আড়াই লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এই সমীক্ষায় অংশ নেন। সেখান থেকে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য, বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি কমেছে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। অনেকেই আগের মতো ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য আর শেয়ার করছেন না। হ্যাঁ, আগে যেখানে প্রতিদিন ব্রেকফাস্টে কী খাওয়া হল, কোথায় গেলাম, কার সঙ্গে আছি- সব আপলোড সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা হতো, এখন সেটাই অনেক কমে গেছে। এই বদলে যাওয়া আচরণকেই বলা হচ্ছে- Posting Zero।

Posting Zero কী?
‘পোস্টিং জিরো’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন মার্কিন সাংবাদিক কাইল চেয়কা। নিজের জনপ্রিয় কলাম Infinite Scroll-এ তিনি লেখেন- “আমরা হয়তো এমন এক যুগে ঢুকছি, যেখানে সাধারণ মানুষ আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করবে না।” কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? কারণ, মানুষ এখন বুঝতে পারছে- সবকিছু শেয়ার করার দরকার নেই। প্রাইভেসি দিনদিন কমে যাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া এখন বেশি ‘ফেক’ বাস্তব জীবনের বদলে ভার্চুয়াল লাইফে মানুষ ক্লান্ত। ফলে অনেকে ঠিক করছেন- আর নয়, এবার কম শেয়ার করবেন। এই নীরব বিদ্রোহই হলো Posting Zero Trend।
বিজ্ঞাপন আর AI কনটেন্টে ক্লান্ত মানুষ
সোশ্যাল মিডিয়ার আরেকটা বড় সমস্যা বিজ্ঞাপনের আধিক্য। এআই দিয়ে বানানো ভুয়ো কনটেন্ট, বট অ্যাকাউন্টের আধিপত্য। একসময় প্ল্যাটফর্মগুলো ছিল বন্ধু, পরিবার, পরিচিতজনদের জন্য। আজ সেখানে ঢুকলেই চোখে পড়ে-স্পন্সরড পোস্ট, ইনফ্লুয়েন্সার প্রচার, AI দিয়ে তৈরি ভিডিও, ক্লিকবেট কনটেন্ট। ফলে প্রশ্ন জাগছে- “আমি আসলে কার সঙ্গে কথা বলছি? মানুষ নাকি মেশিন?” এই জায়গা থেকেই ‘ডেড ইন্টারনেট থিওরি’র ধারণা তৈরি হয়েছে। যেখানে বলা হয়- অনলাইনে এখন সত্যিকারের মানুষের চেয়ে বট আর এআই কনটেন্টই বেশি। এটাই মানুষকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে।
তরুণ প্রজন্ম কেন এগিয়ে?
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে Gen Z এবং Millennials দের মধ্যে। ওরা বুঝতে পারছে-
সোশ্যাল মিডিয়া মানসিক চাপ বাড়ায়, তুলনা করার প্রবণতা তৈরি করে। সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ায়, মনোযোগ নষ্ট করে।
তাই অনেকেই এখন- অ্যাপ ডিলিট করছে, স্ক্রিন টাইম কমাচ্ছে, ম্যাসেজের বদলে সরাসরি কথা বলছে, রিয়াল লাইফে সময় কাটাচ্ছে। এটা একধরনের ডিজিটাল ডিটক্স মুভমেন্ট।সোশ্যাল মিডিয়ার বদলে এখন ট্রেন্ড হচ্ছে- বই পড়া, হাঁটাহাঁটি, রিয়েল সম্পর্ক, নতুন হবি। এক কথায়- ভার্চুয়াল দুনিয়া ছেড়ে বাস্তব জগতে ফেরা।
তা হলে কি সোশ্যাল মিডিয়ার দিন শেষ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন- না, একেবারে শেষ নয়। কিন্তু এর ব্যবহার অবশ্যই বদলাবে। ভবিষ্যতে মানুষ সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করবে প্রয়োজন হিসেবে, নেশা হিসেবে নয়। আর এই পরিবর্তনের নামই- Posting Zero Movement।
সোশ্যাল মিডিয়া এমন এক জগৎ, যা আমাদের যুক্তও করে, আবার একাকীও করে। আজ যখন মানুষ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, তখন প্রশ্ন থেকেই যায়- আপনি কি এখনও সব কিছু পোস্ট করেন? নাকি আপনিও চলে গেছেন ‘Posting Zero’-র দিকে? ডিজিটাল দুনিয়ার এই নীরব বিপ্লব কিন্তু ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।