সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্ভুলতা ও ধ্বংসক্ষমতার দিক থেকে ব্লু স্প্যরো এই সিরিজের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। দাবি করা হচ্ছে, খামেনেইকে লক্ষ্য করে চালানো হামলায় এই মিসাইলই ব্যবহার করা হয়।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার আকাশে সেই দিনটি যেন আচমকাই বদলে গিয়েছিল ইতিহাসের মোড়। যেদিন তেহরানের আকাশে প্রথমে শোনা যায় তীব্র শব্দ। তারপর মুহূ্র্তের মধ্যে আকাশ ছিঁড়ে নেমে আসে একের পর এক আগুনঝরা ক্ষেপণাস্ত্র। কয়েক সেকেণ্ডের ব্যবধানে পরপর বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে গোলা এলাকা। লক্ষ্য ছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইয়ের বাসভবন ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্থাপনা। হামলার তীব্রতা এতটাই ছিল যে মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া, আগুন ও ধ্বংসস্তূপে ঢেকে যায় তেহরানের একটি বড় অংশ। সেই ভয়াবহ আঘাতের মধ্যে শেষ হয়ে যায় ইরানের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতার জীবন। তিনি তাঁর অফিসেই কাজ করছিলেন সেই সময়ই এই হামলা হয়। তবে হামলার পর যত সময় গড়িয়েছে, ততই এই মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন প্রশ্ন, বিতর্ক ও জল্পনা।
সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এই হামলার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল ইজরায়েলের অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্লু স্প্যারো। ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ভান্ডারে স্প্যারো সিরিজের তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে ব্লু স্প্যারো, ব্ল্যাক স্প্যারো ও সিলভার স্প্যারো। এই তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রই মূলত ব্যালিস্টিক প্রযু্ক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি যা দূরপাল্লা থেকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে লক্ষ্যবস্ততে আঘাত হানতে সক্ষম। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্ভুলতা ও ধ্বংসক্ষমতার দিক থেকে ব্লু স্প্যরো এই সিরিজের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। দাবি করা হচ্ছে, খামেনেইকে লক্ষ্য করে চালানো হামলায় এই মিসাইলই ব্যবহার করা হয়েছিল, কারণ এটি দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধ্বংস করার জন্য তৈরি। প্রযুক্তিগত দিক থেকে ব্লু স্প্যারোর কাজ করার পদ্ধতি বেশ অভিনব এবং মারাত্মক কার্যকর। সাধারণভাবে একটি বস্তুকে যদি অত্যন্ত শক্তি দিয়ে আকাশের দিকে ছোড়া হয় তবে সেটি মাধ্যাকর্ষণের টানে আবার দ্রুতগতিতে মাটির দিকে নেমে আসে। ঠিক সেই ধরনের ব্যালিস্টিক গতিপথ অনুসরণ করে এই মিসাইল। ব্লু স্প্যারো কী? এটি মূলত একটি এয়ার লঞ্চড মিসাইল। অর্থাৎ যুদ্ধবিমান থেকে এটি নিক্ষেপ করা হয়। উৎক্ষেপণের পর এটি বায়ুমণ্ডলের উচ্চ স্তর পর্যন্ত উঠে যায় ও তারপর প্রচণ্ড গতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে আসে। সেই সময় মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও রকেট প্রপেলান্টের শক্তি মিলিয়ে এর গতি এতটাই বৃদ্ধি পায় যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে তা প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে আঘাতের মুহূর্তে যে বিস্ফোরণ ঘটে, তা চারপাশে ব্যাপক ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।
ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা সংস্থা রাফেল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্লু স্প্যারো মিসাইলের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬.৫১ মিটার এবং ওজন প্রায় ১৯০০ কেজি। একক স্তরীয় রকেট প্রপেলান্ট ব্যবহারের মাধ্যমে এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে উড়তে পারে। এর পাল্লা প্রায় ২০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। ফলে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুকেও সহজেই আঘাত করা সম্ভব। নেভিগেশনের জন্য এতে জিপিএস এবং আইএনএস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। যা মিসাইলকে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সাহায্য করে। স্প্যারো সিরিজের অন্য দুটি মিসাইল ব্ল্যাক স্প্যারো ও সিলভার স্প্যারো মূলত ভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক হুমকির অনুকরণ বা প্রতিরক্ষা পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয় তবে তাদের ক্ষমতা ও পাল্লা আলাদা। জানা গিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে তেহরানে নিজের বাসভবনে কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও প্রশাসনিক আধিকারিকের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেছিলেন আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। সেই সময়ই আকাশ থেকে নিক্ষেপ করা হয় ব্লু স্প্যারো-সহ ৩০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তেহরানের আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় ও একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। সুপ্রিম লিডারের বাসভবন ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই বিস্ফোরণের আঘাতেই খামেনেই-সহ একাধিক শীর্ষস্থানীয় আধিকারিকের মৃত্যু হয় বলে দাবি করা হয়েছে। হামলার পর উদ্ধারকাজ শুরু হলেও ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ এতটাই ছিল যে পরিস্থিতি সামাল দিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

তবে ঘটনার পর থেকেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। নতুন করে সামনে এসেছে নানা প্রশ্ন। ঠিক কীভাবে এই হামলা চালানো হল। কোথা থেকে মিসাইল নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং কীভাবে এত শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তেহরানের কেন্দ্রস্থলে এমন হামলা সম্ভব হল। কোথা থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল এই ক্ষেপণাস্ত্র। আদৌ কি ব্লু স্প্যারোই ছিলে সেই মারাত্মক আঘাতের নেপথ্যের অস্ত্র? এই সব প্রশ্ন ঘিরেই চলছে আন্তর্জাতিক মহলে তুমুল আলোচনা। কেউ বলছেন এটি ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সামরিক অভিযান, আবার কেউ মনে করছেন এই হামলার পেছনে আরও জটিল কৌশল ও গোয়েন্দা তৎপরতা কাজ করেছে। তবে খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পশ্চিম এশিয়ায়। এই হামলার পর পাল্টা বড় কোনও প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। ইরানের অভ্যন্তরেও ক্ষোভ ও উত্তেজনা বাড়ছে। আর একই সঙ্গে সীমান্ত জুড়ে সামরিক তৎপরতা বাজড়ানোর খবরও সামনে আসছে। ফলে অনেকেরই আশঙ্কা খামেনেইয়ের মৃত্যু হয়তো শুধু একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়। বরং আরও বড় সংঘাতের সূচনা। কারণ তার মৃত্যুর পরেও পশ্চিম এশিয়ায় হামলা ও পাল্টা হামলার আশঙ্কা থামেনি। বরং আক্রমণের ছায়া যেন আরও ঘন হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে স্পষ্ট যে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুধু একজন নেতার জীবনই কেড়ে নেয়নি। এই ঘটনা সারা বিশ্বের রাজনীতি, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ শক্তির সমীরকরণকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। বলাই যায়, খামেনেইয়ের মৃত্যু তাই শুধু একজন নেতার জীবনাবসানের খবর নয় এটি পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলেই মনে করছেন অনেকেই। আকাশ থেকে ধেয়ে আসা সেই ক্ষেপণাস্ত্র কয়েক মুহূর্তে একটি অধ্যায় শেষ করে দিলেও তার প্রভাব হয়তো আরও বহুদিন ধরে ছড়িয়ে থাকবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি এবং সামরিক কৌশলের অন্দরে। তাই ধ্বংসস্তূপের ধোঁয়া হয়তো একদিন মিলিয়ে যাবে। কিন্তু সেই দিনের বিস্ফোরণের প্রতিধ্বনি পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে রয়ে যাবে। নতুন প্রশ্ন, নতুন উত্তেজনা ও অজানা ভবিষ্যেতের ইঙ্গিত নিয়ে।