শওকত-পুত্রের ‘সোনার খনি’তে হাত প্রশাসনের!

মাতলা নদীর চরের বিলাসবহুল ক্যাফে বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া সময়ের অপেক্ষা!

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটতেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ে এবার বেআইনি নির্মাণ ও ক্ষমতার আস্ফালনের বিরুদ্ধে বড়সড় পদক্ষেপের পথে হাঁটল জেলা প্রশাসন। তৃণমূল জমানায় সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার ক্যানিংয়ে মাতলা নদীর চর দখল করে তৈরি হওয়া ক্যানিং পূর্বের প্রাক্তন বিধায়ক শওকত মোল্লার ছেলে ইমরান মোল্লার বিলাসবহুল ক্যাফে ‘অরণ্যের কূলে’ এবার গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল।
ইতিমধ্যেই ক্যানিংয়ের মহকুমা শাসকের (SDO) দফতর থেকে ক্যাফে মালিক ইমরান মোল্লাকে একটি কড়া আইনি নোটিশ ধরানো হয়েছে। আগামী ২৯ জুনের মধ্যে ওই সম্পূর্ণ বেআইনি ক্যাফেটেরিয়াটি নিজ দায়িত্বে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায়, নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হলেই প্রশাসনিক বুলডোজার দিয়ে সেটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে প্রশাসন।
প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে ক্যানিং পূর্বের তৎকালীন দাপুটে বিধায়ক শওকত মোল্লার রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তাঁর পুত্র ইমরান মোল্লা মাতলা নদীর চরের একটি বিশাল অংশ গায়ের জোরে দখল করেন।

সমস্ত সরকারি নিয়ম-নীতি, পরিবেশ আদালতের নির্দেশিকাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নদীর চরের সেই প্লাবনভূমিতে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘অরণ্যের কূলে’ নামক একটি ঝাঁ-চকচকে, বিলাসবহুল ক্যাফেটেরিয়া। সুন্দরবনের পর্যটকদের আকর্ষণ করতে নদীর বুকে তৈরি এই আধুনিক ক্যাফে থেকে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের টাকা আয় হতো বলে অভিযোগ। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যায়।
ক্যানিং ও ভাঙড় এলাকায় একটা সময় শওকত মোল্লার নামেই বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই সাম্রাজ্যে ধস নেমেছে। ভাঙড়ে হওয়া একটি বড়সড় বোমাবাজির মামলায় পুলিশ ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করেছে ক্যানিং পূর্বের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লাকে। বর্তমানে শওকত গরাদের ওপারে, অর্থাৎ শ্রীঘরে দিন কাটাচ্ছেন।

শওকত জেলবন্দি হতেই ক্যানিং জুড়ে শওকত পরিবারের নানা বেআইনি কীর্তি ও সম্পত্তি নিয়ে সাধারণ মানুষ ও পরিবেশকর্মীরা মুখ খুলতে শুরু করেন। মাতলা নদীর চর দখল করে গড়ে ওঠা ওই বিলাসবহুল ক্যাফেটি নিয়ে প্রশাসনের কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। ক্ষমতার হাতবদল হওয়ায় প্রশাসনও এই বেআইনি দখলদারির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে আর এক মুহূর্ত দেরি করেনি। কাগজপত্র খতিয়ে দেখেই কড়া দাওয়াই জেলা প্রশাসনের।

অভিযোগ পাওয়ার পরপরই দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন ও ক্যানিং মহকুমা শাসকের দফতরের আধিকারিকরা ‘অরণ্যের কূলে’ ক্যাফেটির জমি সংক্রান্ত সমস্ত নথিপত্র এবং লাইসেন্স খতিয়ে দেখেন। তদন্তে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সেচ দফতর বা পরিবেশ দফতরের কোনওরকম অনুমতি ছাড়াই সম্পূর্ণ গায়ের জোরে মাতলা নদীর সরকারি চরভূমির ওপর এই বহুতল ক্যাফেটি খাড়া করা হয়েছিল।

এরপরই মহকুমা শাসকের অফিস থেকে জেলবন্দি ইমরান মোল্লাকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি ও পরিবেশগত আইন লঙ্ঘন করে তৈরি এই নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ। তাই আগামী ২৯ জুনের মধ্যে মালিকপক্ষকে নিজ খরচে এই অবৈধ কাঠামো সরিয়ে নিতে হবে।
যদি ২৯ জুনের মধ্যে ওই ক্যাফে ভেঙে ফেলা না হয়, তবে ৩০ জুন সকাল থেকেই প্রশাসনের তরফ থেকে বুলডোজার নামিয়ে ওই অবৈধ সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে এবং তার যাবতীয় খরচও শওকত-পুত্রের থেকেই উসুল করা হবে। প্রশাসনের এই কড়া পদক্ষেপে ক্যানিং জুড়ে যেমন তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে, তেমনই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা।