“বঙ্কিমকে জেতান, দায়িত্ব আমার” বড় ঘোষণা অভিষেকের

তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানান বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগর বিধানসভা কেন্দ্রে নির্বাচনী উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। সেই আবহেই ছয়েরঘেরি কালিগির মাঠে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরার সমর্থনে এক বিশাল জনসভা করলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। জনসভায় উপস্থিত ছিলেন হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। সভামঞ্চ থেকে একদিকে যেমন উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরেন তিনি, অন্যদিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানান বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে।
বক্তব্যের শুরুতেই সাগর এলাকার সঙ্গে তাঁর আবেগের সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন অভিষেক ব্যানার্জি। তিনি বলেন, এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যা ও বঞ্চনার কথা মাথায় রেখেই রাজ্য সরকার ধারাবাহিকভাবে উন্নয়নের কাজ করে চলেছে। তাঁর কথায়, “সাগরের উন্নয়ন আমাদের অগ্রাধিকার। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করাই আমাদের লক্ষ্য।”


উন্নয়নের উদাহরণ হিসেবে তিনি মুড়িগঙ্গা নদীর ওপর প্রস্তাবিত সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন। প্রায় ১৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতুর কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান। তাঁর দাবি, এই সেতু তৈরি হলে সাগর দ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে, যা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
এছাড়াও তিনি নামখানায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুর কথাও উল্লেখ করেন, যা ২০১৯ সালে সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। পাশাপাশি হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদীর ওপর প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক মৎস্য বন্দর নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে বলেও জানান। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকা আরও মজবুত হবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে বলে তাঁর বক্তব্য।
তৃণমূল প্রার্থী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরার সমর্থনে সরাসরি ভোটের আবেদন জানিয়ে অভিষেক বলেন, “বঙ্কিম হাজরাকে জেতালে সাগরের উন্নয়নের সম্পূর্ণ দায়ভার আমি নেব।” তাঁর এই ঘোষণায় সভাস্থলে উপস্থিত জনতার মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়। তিনি আশ্বাস দেন, আগামী দিনে সাগরের উন্নয়নে কোনও খামতি রাখা হবে না।
সভা থেকে তিনি আরও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দেন। ঘোড়ামারা দ্বীপের প্রায় ১২০০ পরিবারকে ভোটের পর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সাগরের প্রতিটি বাড়িতে নলবাহিত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলেও জানান। এর ফলে দীর্ঘদিনের পানীয় জলের সমস্যা মিটবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিজেপিকে আক্রমণ করে অভিষেক ব্যানার্জি বলেন, “মোদির গ্যারান্টি মানেই জিরো ওয়ারেন্টি।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, গত ১২ বছরে কেন্দ্রীয় সরকার বাংলার জন্য কী করেছে। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্র বারবার রাজ্যের প্রাপ্য অর্থ আটকে রেখেছে, যার ফলে উন্নয়নের কাজে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। তবুও রাজ্য সরকার নিজের তহবিল থেকে ১০০ দিনের কাজের মজুরি প্রদান এবং আবাস যোজনার ঘর নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও জানান, সাগর অঞ্চলে ইতিমধ্যেই প্রায় ১ লক্ষ ৭ হাজার মহিলা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের আওতায় আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন। পাশাপাশি প্রায় ৩৫ হাজার যুবক-যুবতী ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন। এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে রাজ্য সরকার সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে বলে তিনি জানান।
গঙ্গাসাগর মেলা প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেন, এই বিশাল আয়োজন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি কুম্ভ মেলার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, যেখানে ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, সেখানে গত এক দশকে গঙ্গাসাগরে বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। এই সাফল্যের কৃতিত্ব তিনি রাজ্য প্রশাসনের সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনাকে দেন।
বিজেপির দলবদলু প্রার্থীদের কটাক্ষ করে তিনি বলেন, যাঁদের এই এলাকার ভূগোল, সংস্কৃতি বা মানুষের সমস্যা সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই, তাঁদের দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি দাবি করেন, আসন্ন নির্বাচনে সেই সব প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হবে।
সভায় উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বিজেপি আপনাদের বারবার লাইনে দাঁড় করিয়েছে—নোটবন্দি থেকে রেশন পর্যন্ত। এবার আপনারা লাইনে দাঁড়িয়ে ইভিএমে তার জবাব দিন।” তাঁর এই বক্তব্যে সভাস্থলে জোর হাততালি পড়ে এবং সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
সবশেষে তিনি বলেন, তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার সবসময় মানুষের পাশে থেকেছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও পর্যটন—সব ক্ষেত্রেই আরও উন্নয়নের আশ্বাস দেন তিনি। জনসভা শেষে সাগরের মাটি থেকে আশীর্বাদ নিয়ে অভিষেক ব্যানার্জি তাঁর পরবর্তী কর্মসূচির উদ্দেশ্যে নন্দীগ্রামের দিকে রওনা দেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই জনসভা সাগর বিধানসভা কেন্দ্রে নির্বাচনী লড়াইকে আরও তীব্র করে তুলেছে এবং ভোটের আগে তৃণমূলের শক্তি প্রদর্শনের এক বড় মঞ্চ হয়ে উঠেছে।