পালিত হল ‘কঠিন চীবর দান’ অনুষ্ঠান

চলছে উৎসবের মরশুম। শহরের বুকে পালিত হল’ কঠিন চীবর দান’ উৎসব। বৌদ্ধ ধর্মের অতি পবিত্র উৎসব হল ‘কঠিন চীবর দান’। প্রতিবছর নিষ্ঠার সঙ্গে এই উৎসব পালন করেন বৌদ্ধ ধর্মের মানুষেরা। শারদ উৎসব পালনের এক মাসের মধ্যে যেকোনো দিন এই উৎসব পালন করা হয়।

নাজিয়া রহমান, নিজস্ব প্রতিনিধি: প্রতিবছরের মতো এবারও শহর কলকাতায় কঠিন চীবর দান উৎসব পালিত হল। প্রতিবছর এই উৎসব শারদ পূর্ণিমা বা আশ্বিন মাস মাসের পূর্ণিমায় আয়োজন করা হয়। শারদ উৎসব পালনের এক মাসের মধ্যে যেকোনো দিন এই উৎসব পালন করা হয়। এই অনুষ্ঠানটি মূলত বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরকে ত্রি-চীবর নামে একটি বিশেষ পোশাক দান করা হয়। তবে শুধুমাত্র পোশাক নয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পূণ্যের আশায় পোশাকের সাথে আরও অনেক সামগ্রী দান করেন।

এখন প্রশ্ন এই কঠিন চীবর উৎসবটি কি? এই ত্রি-চীবরই বা কি? ত্রি-চীবর বলতে বোঝায়, চার খণ্ডের পরিধেয় বস্ত্র, যাতে রয়েছে দোয়াজিক, অন্তর্বাস, চীবর ও কটিবন্ধনী। পূণ্য লাভের আশায় বৌদ্ধ ধর্মের মানুষেরা এই পোশাক দান করেন বৌদ্ধ ভিক্ষুদের। এই পোশাক তৈরির ধরণও আছে। এই পোশাক তৈরি করার জন্য প্রথমে তুলার বীজ বোনা হয়, পরে তুলা সংগ্রহ করা হয়, সেই তুলো থেকে সুতো কাটা হয়, সেই সুতোয় রং করা হয় গাছ-গাছড়ার ছাল বা ফল থেকে তৈরি রং দিয়ে, এবং সবশেষে নানা আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় নিয়ম-কানুন মেনে মাত্র ২৪ ঘণ্টায়, অর্থাৎ এক দিনের ভিতর তৈরি করা হয় এই ত্রি-চীবর। এই পোশাক বোনায় ব্যবহার করা হয় বেইন বা কাপড় বোনার বাঁশে তৈরি ফ্রেম। এরকম বেইনে একসঙ্গে চারজন কাপড় বুনে থাকেন। এভাবে ২৪ ঘণ্টা পর তৈরি হওয়া সেসব পবিত্র চীবর, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হাতে তুলে দেয়া হয় এক কঠোর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে।এভাবে চীবর দান করা হলে কায়িক-বাচনিক ও মানসিক পরিশ্রম বেশি ফলদায়ক হয় বলে বৌদ্ধ শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে। তাই পূণ্য লাভের আশায় বৌদ্ধ ধর্মের মানুষেরা এভাবে কঠোর পরিশ্রমে তৈরি করেন চীবর।এই ধরণের দান করার মাধ্যমে কোনও প্রতিদানের আশা করেন না বৌদ্ধ ধর্মের মানুষেরা। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষদের মত এজাতীয় অনুষ্ঠান সমাজে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে। সেই বিশ্বাসের উপর ভর করে এই অনুষ্ঠান পালন করা হয়।

শনিবার টালিগঞ্জের ম্যুর এভিনিউ বুদ্ধ সমিতির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত কঠিন চীবর উৎসবটির আয়োজন করা হয়। এদিন টালিগঞ্জ সম্বোধি বুদ্ধ বিহারে এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঘিরে ছিল ভক্তদের বিপুল উৎসাহ।বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, কঠিন চীবর দান একটি মহাপুণ্যের কাজ। এদিনের এই অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশ থেকে বহু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী যোগ দেন। ভক্তরা শ্রদ্ধা ভরে ভিক্ষুদের হাতে ত্রি চীবর দান করেন। অনুষ্ঠানের দিন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতী ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে সম্বর্ধনাও তুলে দেওয়া হয়।অনুষ্ঠান উপলক্ষে এলাকায় এক শান্তি চীবর পরিক্রমা পদযাত্রারও আয়োজন করা হয়। পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেন টালিগঞ্জ সম্বোধি বুদ্ধ বিহারের পরিচালক অরুণজ্যোতি ভিক্ষু। তিনি বলেন,
“বর্তমান সময়ে গৌতম বুদ্ধের দেখানো শান্তি ও সহানুভূতির পথ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সেই পথেই আমাদের সকলকে এগিয়ে যেতে হবে।”
এই দানোৎসবের মধ্য দিয়ে টালিগঞ্জ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ধর্মীয় সৌহার্দ্য ও মানবতার বার্তা।

প্রসঙ্গত, ভারতীয় জনপদে ‘কঠিন চীবর দান’ শব্দটি গৌতম বুদ্ধের সময় থেকেই প্রচলিত হয়ে চলেছে। এই অনুষ্ঠানের নামকরণ এমন কেন করা হয়েছে। এনিয়ে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের বক্তব্য, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তুলা কেটে, সুতা বানিয়ে, রং করে, নানা রকম আচার ও নিয়ম মেনে একেকটি চীবর তৈরি করা হয়। এই ক কাজটি খুব বেশি কঠিন বলেই অনুষ্ঠানের এই নাম ‘কঠিন চীবর দান’।’চীবর’ শব্দের অর্থ ভিক্ষুদের পরিধেয় বস্ত্র। গাছের শেকড়, গুঁড়ি, ছাল, শুকনো পাতা, ফুল ও ফলের রঙ অনুসারে এই বস্ত্রের ছয়টি রঙ নির্দিষ্ট । তবে সবচেয়ে লাল ফুলের রঙের বস্ত্রই বেশি দান করা হয়। কথিত আছে, গৌতম বুদ্ধের সময় বিশাখা, বুদ্ধের জন্য একদিনের মধ্যে এই কঠিন কাজগুলি সম্পন্ন করে বস্ত্র তৈরি করে দিয়েছিলেন। তারপর থেকে নির্ধারিত সময়সীমা মেনে এই নিয়ম পালন করে আসছেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মনুষেরা।