রাজ্যকে চরম দারিদ্রসীমা থেকে মুক্ত করে দেখাল কেরল। বিশ্বের দ্বিতীয় হিসাবে এই কৃতিত্ব অর্জন করল দক্ষিণের বাম শাসিত রাজ্য।

রিমা দত্ত, সাংবাদিক: কথায় বলে চেষ্টা করলে সব সম্ভব। পারিনা এই শব্দটাকে মুছে ফেলা যায়। এইটা যে শুধু কথার কথা নয়, তা হাতে কলমে করে দেখাল ‘গডস ওন কান্ট্রি’ বা ঈশ্বরের আপন দেশ কেরল। কী করে দেখাল কেরল, রাজ্যকে চরম দারিদ্রসীমা থেকে মুক্ত করে দেখাল। দেশের একমাত্র এবং প্রথম রাজ্য যেখানে চরম দারিদ্রসীমার নেচে কেউ নেই, একজনও নেই। অফিশিয়ালি জানাল কেরল। কেরলে বাম শাসন চলে। শনিবার কেরলের ৬৯তম প্রতিষ্ঠা দিবসে কিরাভিতে বিধানসভায় ঘোষণা করলেন, কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। ভারতের প্রথম রাজ্য হিসাবে শুধু নয়, বিশ্বের দ্বিতীয় হিসাবে এই কৃতিত্ব অর্জন করল দক্ষিণের বাম শাসিত রাজ্য।

২০২০সালে চিন ঘোষণা করেছিল তাদের প্রতিটি প্রদেশ চরম দ্রারিদ্র থেকে মুক্তি পেয়েছে। তারপর কেরল এই ঘোষণা করল। চিন যা পেরেছিল তা পারল কেরলও। কোন পথে দারিদ্র দূরিকরণে এই সাফল্য এল, শনিবার রাজ্যের সাফল্যের কথা ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,
‘দেশের প্রথম চরম দারিদ্র-মুক্ত রাজ্য হল কেরল
এই বিধানসভা অতীতে অনেক ঐতিহাসিক ঘোষণার সাক্ষী থেকেছে
আজ আরও একটি মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলল নতুন কেরল’
তিনি আরও বলেন, ২০২১ সালে তাঁর সরকারের শপথের পারে নতুন মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে যে সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার অন্যতম ছিল রাজ্যকে চরম দারিদ্রমুক্ত করা। সেই মতো পরবর্তী ৪ বছর ধরে সেই লক্ষ্যপূরণের জন্য তাঁর সরকার কাজ করেছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। তিনি বলেন, গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যবাসীকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বামজোট। এদিন তা পূরণ হল। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে বিরোধীদেরও এই কাজে এগিয়ে আসতে বলেন তিনি। এই সাফল্য পাওয়ার লক্ষ্যে হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে কুদুম্বশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে…
২০ হাজার ৬৪৮ টি পরিবারের দৈনিক খাবার
চিকিৎসা, ওষুধের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে
৮৫ হাজারের বেশি মানুষের মাথার উপরে ছাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে
সাড়ে ৫ হাজার বাড়ি তৈরি করা হয়েছে
আরও ৫হাজার বাড়ি মেরামত করা হয়েছে
কিছু বাড়ি তৈরির কাজ এখনও চলছে
২৭০০ গৃহহীন পরিবারকে বাড়ি বানিয়ে দেওয়া হয়েছে
রাজ্যের ২১হাজার ২৬৩ জন নাগরিককে
রেশন কার্ড, আধার কার্ড দেওয়া হয়েছে
রাজ্যজুড়ে ৬৪ হাজারের বেশি সংবেদনশীল পরিবারকে চিহ্নিত করা হয়েছে
তবে দ্রারিদ্রসীমার নীচে বলতে কী বলা হয়, বিশ্বব্যাঙ্কের হিসেবে, দৈনন্দিন তিন ডলারের কম, অর্থাৎ ভারতের নিরিখে দৈনিক ২৫০ টাকার কম আয়ের পরিবারকে চরম দারিদ্রসীমার নীচে বলে ধরা হয়। আবার নীতি আয়োগের হিসাবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবনযাত্রার মান-সহ ১২টি মাপকাঠিতে এই হিসেব করা হয়। কেরল সরকারের তরফে বলা হয়েছে, এই দুইটি মাপকাঠির কোনওটিকেই না মেনে চরম দারিদ্রসীমার নীচে থাকা প্রতিটি পরিবারকে তাদের আয়, স্বাস্থ্য, আশ্রয়, খাদ্যের নিরিখে চিহ্নিত করা হয়। তারপরের ধাপে স্থনীয় স্বশাসিত পরিষদগুলির মাধ্যমে এক্সট্রিম পভার্টি ইরাডিকেশন প্রজেক্টের সহায়তায় একাধিক পদক্ষেপ করা হয়, এবং প্রতিটি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হয়। ভারতের প্রথম রাজ্য হিসাবে কেরল এই কৃতীত্ব অর্জন করার পাঁচ বছর আগেই কমিউনিস্ট-শাসিত চিন সেখানকার প্রতিটি প্রদেশকে চরম দারিদ্রমুক্ত বলে ঘোষণা করেছিল দেশের একমাত্র বামশাসিত রাজ্যের এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত দলের নেতা, মন্ত্রীরা। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে,
বিহার
ভারতের সবচেয়ে দরিদ্রতম রাজ্য হল বিহার
বিহারের মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৪৬,০০০ টাকা
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে
বিহার ভারতের তৃতীয় সর্বাধিক জনবহুল রাজ্য
বিহারের জনসংখ্যা ১০লক্ষ ৪০৯৯ জন
উত্তরপ্রদেশ
উত্তরপ্রদেশ ভারতের বৃহত্তম জনসংখ্যার রাজ্যগুলির অন্যতম উত্তরপ্রদেশ
এ রাজ্যের জনপ্রতি জিডিপি ৬৫হাজার টাকারও বেশি
ঝাড়খণ্ড
ঝাড়খণ্ড খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ
তবুও মাথাপিছু জিডিপি মাত্র ৭৫ হাজার টাকা
মেঘালয়
ঝাড়খণ্ডে মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৮২,০০০ টাকা
অপর্যাপ্ত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং দুর্বল
পরিকাঠামোর সম্মুখীন উত্তর-পূর্বের এই রাজ্য
অসম
অসমে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি
প্রান্তিক সম্প্রদায়ের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য
এ রাজ্যের মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৮৬ হাজার টাকা
মধ্যপ্রদেশ
মধ্যপ্রদেশের ৯৮,০০০ টাকা মাথাপিছু জিডিপি-সহ
শিল্প উন্নয়নের গতির হার অত্যন্ত ধীর
এছাড়াও গ্রামীণ জনসংখ্যাও খুব বেশি
যা এই রাজ্যের উন্নয়ের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ
জম্মু ও কাশ্মীর
জম্মু ও কাশ্মীরের মাথাপিছু জিডিপি ১,০৪,০০০ টাকা
কৃষির উপর অতি নির্ভরতার কারণে এখানে দারিদ্র্যের হার ১০ শতাংশ
চরম দারিদ্র বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়, যেখানে নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতেও অক্ষম হন সেই রাজ্যের নাগরিকরা। জোটাতে পারেন না খাবার, থাকে না মাথার উপর ছাদ। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কাপড় কিছুই জোটানোর ক্ষমতা থাকে না। সেই রাজ্যগুলিই দরিদ্রসীমার নীচে। কেরল যে সম্পূর্ণ ভাবে চরম দারিদ্রসীমার বাইরে বেরোতে চলেছে, তা আগেই জানা গিয়েছিল। নভেম্বর মাসে সরকারি ভাবে তা ঘোষণা হওয়ার কথা ছিল। ১ নভেম্বরে রাজ্যকে দারিদ্রমুক্ত বলে ঘোষণা করে দিলেন বিজয়ন। যেখানে নরেন্দ্র মোদী সরকার ডবল ইঞ্জিনের কথা বলেন, সেখানে স্বাধীনতার ৭৮ বছর ভারতেরই একটা রাজ্য নিজেদের চরম দারিদ্র থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা ঘোষণা করল।