কেরালার নাম বদলে এবার হল কেরলম। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সেই রাজ্যের নাম প্রস্তাবে সায় দিয়ে দিল। পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলে বাংলা হবে ?

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক: বদলে যাচ্ছে আরও এক রাজ্যের নাম। সামনেই ভোট রয়েছে সে রাজ্যে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সেই রাজ্যের নাম প্রস্তাবে সায় দিয়ে দিল। কোন সেই রাজ্য ? কতবার প্রস্তাবের পর এই সায় মিলল ? এর আগে কোন কোন রাজ্যের নাম বদলেছে ? নাম বদলের আর্জি জানিয়েও সায় মেলেনি কোন রাজ্যের ? এই তালিকায় কীভাবে যুক্ত হল পশ্চিমবঙ্গের নাম ?
পূর্বে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা। পশ্চিমে আরব সাগর। মাঝে সরু উপকূলীয় রাজ্য কেরালা। এটি ভৌগোলিকভাবে তিনটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত। পূর্বের উঁচু পাহাড় মাঝের টিলা-উপত্যকা এবং পশ্চিমের সমতল উপকূল। সেই কেরালার নাম বদলে এবার হল কেরলম। চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি এই অনুমোদন দেওয়া হয়, বিধানসভা ভোটের কয়েক মাস আগে। এর আগে কেরলের নামবদলের জন্য দুবার প্রস্তাব পাশ করানো হয়েছে কেরল বিধানসভায়। ২০২৩ সালের অগস্ট এবং ২০২৪-এর জুনে কেরল বিধানসভা সর্বসম্মতপ্রস্তাবে কেরলের বাম সরকার কেন্দ্রকে রাজ্যের নতুন নাম কেরলম করার প্রস্তাব দেয়। ফলে কেরল শিগগিরই কেরলম হতে চলেছে। কেরলম নামটি ঔপনিবেশিক আমলেরও আগে থেকে প্রচলিত। প্রাচীন শিলালিপি ও তামিল সাহিত্যে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেক গবেষক মনে করেন, চের আর আলাম শব্দ থেকে এই নামের উৎপত্তি, যার অর্থ সমুদ্র থেকে যুক্ত হওয়া ভূমি। আবার কেউ বলেন, কেরম অর্থাৎ নারকেল শব্দ থেকেই নামের উৎস।

এর আগে কেরল সরকারের প্রথম প্রস্তাবটি পদ্ধতিগত কিছু ত্রুটি থাকায় ফেরত পাঠিয়েছিল কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। তার পর পুনরায় প্রস্তাব যায় কেন্দ্রের কাছে। এ বার সেই প্রস্তাবে অনুমোদন দিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের ঠিকানা সাউথ ব্লক থেকে সেবাতীর্থ কমপ্লেক্সে যাওয়ার পর মঙ্গলবারই প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক বসেছিল সেখানে। আর সেই বৈঠকেই কেরলের নতুন নামকরণের প্রস্তাবে অনুমোদন দিল ভারত সরকার।
পরে এই নিয়ে নিজের এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে কেরলের মানুষের ইচ্ছার কথা। মোদী লেখেন, কেরলের নাম পরিবর্তন নিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত সে রাজ্যের জনগণের ইচ্ছারই প্রতিফলন। আর এরপরই কেন্দ্রকে বেঁধেন কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর। তিনি দাবি করেন, কেরলের নাম এমনিতেই মালয়ালমে কেরলম। সুতরাং আলাদা করে ইংরেজিতেও সেই নাম নিয়ে আসার অর্থ কী! পাশাপাশি তাঁর দাবি, কেন্দ্র দক্ষিণের এই রাজ্যকে আলাদা করে কোনও প্রকল্প দেয় না। অথচ নামবদলের প্রস্তাবে সায় দিচ্ছে।
কেরালার এই নাম বদলের পরই একটাই প্রশ্ন বারে বারে উঠতে থাকে। কেন নয় পশ্চিমবঙ্গ ? সে আজকের কথা নয়। সালটা ছিল ১৯৯৯, জ্যোতি বসুর সময়কার কথা। পরে ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এসে নামবদল করার প্রস্তাব দেন। তা খারিজ হয়। ২০১৬-য় আবার প্রস্তাব আসে, ইংরেজিতে বেঙ্গল, বাংলায় বাংলা, হিন্দিতে বঙ্গাল। এটিও কেন্দ্র মানেনি। কারণ তিনটি আলাদা ভাষায় তিনটি আলাদা নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। জানানো হয়, একটিই নাম হতে হবে। তারপর ২০১৮-য় বিধানসভা শুধু বাংলা নামের পক্ষে প্রস্তাব পাশ করে। তবু কেন্দ্র তা মঞ্জুর করেনি। কেন্দ্রের বক্তব্য, রাজ্যের নাম বদল সংবিধান সংশোধনের বিষয়, সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আরও একটি আপত্তি তুলেছিল বিদেশ মন্ত্রক। তাদের আশঙ্কা ছিল, বাংলা নামটি বাংলাদেশ-এর সঙ্গে মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। ২০১৬তেও একই আপত্তি উঠেছিল। এমনকি ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতেও রাজ্যসভার এক সাংসদ আবার নাম বদলের দাবি তোলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এখনও ঝুলেই রয়ে গেল।
পশ্চিমবঙ্গ ঝুলে থাকলেও, স্বাধীনতার পর থেকে কেরলের মতো নাম বদলেছে আরও অনেক রাজ্যের। স্বাধীনতার পর ভারতে প্রথমবার নাম বদলেছিল উত্তরপ্রদেশর। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত দেশের বৃহত্তম এই রাজ্যটি ইউনাইটেড প্রভিন্স অব আগরা অ্যান্ড অউধ নামে পরিচিত ছিল। ১৯৫০ সালের ২৫ জানুয়ারি সেই নাম বদলে হয় উত্তরপ্রদেশ। এখন যেটা হায়দরাবাদ, সেটা আগে ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়ার অংশ ছিল । পরে ১৯৪৮ সাল নাগাদ তাকে অন্ধ্রের সঙ্গে ঢুকিয়ে নাম দেওয়া হয় হায়দরাবাদ। ১৯৫৬ সালে সেই রাজ্যের নাম বদলে রাখা হয় অন্ধ্রপ্রদেশ। পরে ২০১৪ সালে এই অন্ধ্র ভেঙে আবার তেলেঙ্গানা তৈরি হয়। মধ্যপ্রদেশের এককালে নাম ছিল মধ্যভারত। ১৯৫৬ সাল নাগাদ তার মধ্যে বিন্ধ্য প্রদেশ ও ভোপালকে মিশিয়ে নতুন নাম রাখা হয় মধ্যপ্রদেশ। এখন যা কর্নাটক। ১৯৫৬-র আগে তা ছিল মহীশূর। দেবভূমি উত্তরাখণ্ড একসময় পরিচিত ছিল উত্তরাঞ্চল হিসেবে। ২০০৬ সালে নাম পালটে রাজ্যটির নাম রাখা হয় উত্তরাখণ্ড। নাম বদলেছে ওড়িশারও। ২০১০ সালে উড়িষ্যা হয় ওড়িশা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ভারতে নাম বদলের চল নতুন নয়। সেই তালিকায় নবতম সংযোজন এই কেরল।