খড়গপুর কেন্দ্র নিয়ে প্রশ্ন করতেই টার্গেট বেঁধে দিলেন দিলীপ ঘোষ। ১ লাখ পারের টার্গেট।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : রাজনীতির আকাশে কখনও কখনও হঠাৎই জমে যায় ঘন কালো মেঘ। আবার সেই মেঘ সরিয়েই কেউ কেউ ফিরিয়ে আনে ঝলমলে রোদ। পশ্চিমবঙ্গের ভোটের প্রাক্কালে সেই রোদ্দুরের নাম যেন আবারও দিলীপ ঘোষ। দীর্ঘ নীরবতা, অভিমান আর দূরত্বের গল্প পেরিয়ে তিনি যেন নতুন করে নিজের অস্তিত্বের ঘোষণা দিলেন। বিজেপির প্রার্থী তালিকায় তাঁর নাম শুধু একটি প্রার্থীর নাম নয় এ যেন এক প্রত্যাবর্তনের গল্প। এক নতুন রাজনৈতিক পুনর্জন্মের ইঙ্গিত। খড়গপুর সদর এই নামটাই যেন দিলীপ ঘোষের সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। এই মাটিই তাঁকে গড়ে তুলেছে, আবার এই মাটিতেই তাঁকে প্রমাণ করতে হবে নিজের শক্তি। দলের ভেতরে নানা টানাপোড়েন, সম্পর্কের ওঠাপড়া, এমনকি প্রার্থী না করার সিদ্ধান্ত সবকিছুর পরেও বিজেপি শেষ পর্যন্ত ভরসা রাখল তাঁর উপরেই। আর এই ভরসার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক বড় বার্তা যে রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা, সংগঠন আর লড়াইয়ের মানসিকতার বিকল্প নেই।
দিলীপ ঘোষের রাজনীতির ধরন অন্যরকম। কথায় ঘুরপথ নেই, বার্তা সরাসরি। এই স্পষ্টভাষী মনোভাবই তাঁকে কখনও বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। আবার একইসঙ্গে তৈরি করেছে এক আলাদা জনভিত্তি। দিলীপ ঘোষ জানেন, কীভাবে ময়দানে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে হয়। কীভাবে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে হয়। তাই তাঁর প্রত্যাবর্তন মানেই শুধু একটি আসনে লড়াই নয় বরং পুরো নির্বাচনী আবহে এক নতুন উত্তাপ বলাই যায়। রাজনীতির ময়দানচা অনেকটাই নাট্যমঞ্চের মতো। কখনও আলো আবার কখনও অন্ধকার। আবার হঠাৎই স্পটলাইট ঘুরে এসে সেই পুরনো মুখই সামনে আসে। বিজেপির প্রথম দফার প্রার্থী তালিকায় যেমন দিলীপ ঘোষের প্রত্যাবর্তন নজর কেড়েছে, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে শুভেন্দু অধিকারীর কৌশলও। তিনি একসঙ্গে দুটি আসনে লড়বেন নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরে। দিলীপ ঘোষ লড়ছেন একটিমাত্র আসন থেকেই। কিন্তু তাঁর লড়াইয়ের গুরুত্ব কোনও অংশে কম নয়। বরং খড়গপুর সদর এখন হয়ে উঠেছে বিজেপির কাছে একপ্রকার প্রেস্টিজ ফাইট। কারণ বর্তমান বিধায়ক হিরণ চট্টোপাধ্যায়কে সরিয়ে এই আসনে দিলীপ ঘোষকে প্রার্থী করা হয়েছে। যা দলীয় অন্দরের বার্তাও বহন করছে। শুভেন্দু অধিকারীর দুটি আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই নিজের পুরনো ভঙ্গিতেই উদাহরণ টেনে আনেন নরেন্দ্র মোদী ও রাহুল গান্ধীর।

একসময় আরএসএসের প্রচারক থেকে উঠে এসে রাজ্য বিজেপির সভাপতি, তারপর সাংসদ। দিলীপ ঘোষের রাজনৈতিক যাত্রা বরাবরই সংগ্রামের। ২০১৯ সালে মেদিনীপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে তাঁর জয় তাঁকে দলের অন্যতম মুখ করে তোলে। খড়গপুর-মেদিনীপুর জুড়ে তাঁর জনসংযোগ, সংগঠনের ভিত গড়া এই সবই ছিল তাঁর শক্তি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সমীকরণে ভাটা পড়ে। ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বর্ধমান-দুর্গাপুর কেন্দ্র থেকে পরাজয়ের পর দলীয় অন্দরে তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দীর্ঘদিন কোনও বড় সভায় দেখা যায়নি তাঁকে ফলে দূরত্বের গুঞ্জনও আরও জোরালো হয়। তবুও রাজনীতির খেলায় শেষ কথা বলে না পতন শেষ কথা বলে প্রত্যাবর্তন তার যেন জল জ্যান্ত উদাহরণ দিলীপ ঘোষ। আর সেই প্রত্যাবর্তনের মঞ্চই এখন খড়গপুর সদর। ২০১৬-তে এই আসন থেকেই লড়ে জিতেছিলেন দিলীপ ঘোষ। জয়ী হয়ে বিধায়ক হন তিনি। পরে ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে মেদিনীপুর কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হওয়ায় তিনি বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেন। তাঁর শূন্য হওয়া আসনে ২০২১ সালে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে তৃণমূল জয়ী হয় প্রদীপ সরকার। ২০২১-এ হিরণ চট্টোপাধ্যায়কে জেতেন এই আসনে। সেই সিদ্ধান্তে দলীয় অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল বলেই মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের। অবশেষে ২০২৬-এর আগে বিজেপি বুঝেছে এই আসনে দিলীপই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে খড়গপুর কেন্দ্র নিয়ে প্রশ্ন করাতেই দিলীপ ঘোষ বেঁধে দিলেন টার্গেট। সেই টার্গেট হল ১ লাখ পারের।
হিরণ চট্টোপাধ্যায়কে ঘিরে বিতর্ক যখন তুঙ্গে তখন সেই সময় প্রশ্ন ছোড়া হল দিলীপ ঘোষের দিকে। কিন্তু তাঁর জবাব? ঠান্ডা ও সংযতই ছিল। প্রশ্ন করা হয় হিরণের কাজকর্ম নিয়ে দিলীপ ঘোষের কাছে কোনো অভিযোগ এসেছে কি না। সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এক ঝটকায় ব্যক্তিগত বিতর্ক থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন তিনি। তবে এখানেই তিনি থামেননি। হিরণের প্রার্থী না হওয়া নিয়ে তিনি বলেন দল যখন একবার ওনাকে নিজের এলাকার বাইরে প্রার্থী করেছে, তখন সিদ্ধান্তটা ভেবেচিন্তেই নেওয়া।
অন্যদিকে তৃণমূলও এই লড়াইকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। খড়গপুরে উন্নয়ন, মূল্যবৃদ্ধি, ভোটার তালিকা সব ইস্যুকেই সামনে এনে বিজেপিকে চাপে রাখার চেষ্টা চলছে। ফলে এই কেন্দ্র এখন শুধুই একটি আসন নয়, বরং দুই রাজনৈতিক দর্শনের সরাসরি সংঘর্ষের মঞ্চ। তবে এই সমগ্র লড়াইয়ের কেন্দ্রে যিনি তিনি তো সেই চেনা দাবাং নেতা দিলীপ ঘোষ। তিনি যে ফুল ফর্মে আছেন তা বলাই যায়। কারণ তিনি পুরানো কর্মীদের অ্যাক্টিভ করা ও অন্য প্রার্থীর হয়ে প্রচারে যাওয়ার জন্যই তিনি প্রস্তুত। চোখে চোখ রেখে কথা বলা, নির্ভীক ভঙ্গিতে প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করা। এই স্টাইলই তাঁকে আলাদা করে তোলে। তিনি ভয় পান না, বরং ভয় দেখান। এই ইমেজই যেন তাঁর শক্তি। দিলীপের এই প্রত্যাবর্তনেই অস্বস্তি বাড়ছে প্রতিপক্ষের। খড়গপুরের মাটিতে আবার ব্যাট তুলে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এবার এই ইনিংস ভোটের লড়াইকে কোন পথে নিয়ে যায় এটা তো সময়ই বলবে।