বাঁকুড়ার রানিবাঁধের বিজেপি বিধায়ক ক্ষুদিরাম টুডু মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েছে গোটা জঙ্গলমহল।

মিলন কর্মকার, নিজস্ব সংবাদদাতা : শুভেন্দুর মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন জঙ্গলমহলের মাটির মানুষ। না আছে বিলাসবহুল বাংলো, না রাজনৈতিক পরিবারের পরিচয়। এক সময় গ্রামের স্কুলে পড়াতেন। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যেতেন স্কুলে। আর আজ সেই মানুষই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী। বাঁকুড়ার রানিবাঁধের বিজেপি বিধায়ক ক্ষুদিরাম টুডু মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েছে গোটা জঙ্গলমহল। তাঁর গ্রামের কাঁচা রাস্তা থেকে উঠোন- সর্বত্র এখন একটাই আলোচনা, “আমাদের গ্রামের ছেলে আজ মন্ত্রী!”
শনিবার রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিনে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপি নেতৃত্বের উপস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারীর মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নেন ক্ষুদিরাম টুডু। আর সেই মুহূর্ত থেকেই বাঁকুড়ার রানীবাঁধ ব্লকের বাগডুবি গ্রামে শুরু হয়ে যায় আনন্দ উৎসব। বিজেপি কর্মীরা আবির খেলেন, মিষ্টি বিলি করলেন, বাজি ফাটালেন। তবে সবচেয়ে বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন গ্রামের সাধারণ মানুষ। কারণ তাঁদের কাছে ক্ষুদিরাম টুডু শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন- তিনি তাঁদের “ঘরের ছেলে”।
আর প্লাস নিউজও পৌঁছে গিয়েছিল তাঁর বাড়িতে। জঙ্গল ঘেরা প্রত্যন্ত গ্রাম। খুব সাধারণ একটা বাড়ি। বাইরে থেকে দেখলে বোঝাই যায় না এই বাড়ির মানুষ এখন রাজ্যের মন্ত্রী। না কোনও বাড়তি চাকচিক্য, না কোনও রাজনৈতিক প্রভাবের ছাপ। এলাকার মানুষ বলছেন, “মন্ত্রী হওয়ার পরেও উনি আগের মতোই আছেন। কোনও অহংকার নেই।”
বাঁকুড়া জেলার রানীবাঁধ ব্লকের জঙ্গলঘেরা বাগডুবি গ্রাম থেকেই শুরু ক্ষুদিরাম টুডুর জীবন সংগ্রাম। সেই সময় এলাকায় রাস্তার অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ। পানীয় জলেরও সমস্যা ছিল। আদিবাসী অধ্যুষিত এই অঞ্চলে উন্নয়ন কার্যত পৌঁছয়নি বললেই চলে। স্থানীয় বাগডুবি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন ক্ষুদিরাম টুডু। পরে তাঁর বাবা যোগেন্দ্রনাথ টুডু ছেলের পড়াশোনার জন্য বারিকুলে হোস্টেলের ব্যবস্থা করেন। বারিকুল উদয় ভারতী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন তিনি। এরপর বাঁকুড়ার সালডিহা কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতার পেশায় যোগ দেন ক্ষুদিরাম টুডু। একজন সাধারণ স্কুলশিক্ষক হিসেবেই দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। এলাকার মানুষ বলছেন, শিক্ষক থাকাকালীনও তিনি ছাত্রছাত্রীদের খুব কাছের মানুষ ছিলেন। শুধু পড়াশোনা নয়, গ্রামের সমস্যার কথাও শুনতেন। তাঁর পারিবারিক জীবনও খুব সহজ ছিল না। পিতা যোগেন্দ্রনাথ টুডু এবং মাতা সুন্দরী টুডুর মৃত্যুর পর পরিবারে একাধিক কঠিন সময় আসে। ২০০৭ সালে তাঁর ছোট ভাইয়েরও মৃত্যু হয়। পরিবারের দায়িত্ব, শিক্ষকতার কাজ- সব সামলে ধীরে ধীরে সমাজের মানুষের সঙ্গে আরও জড়িয়ে পড়েন ক্ষুদিরাম টুডু। এই সময় থেকেই তিনি আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে বিজেপির সংগঠনের কাজ শুরু করেন জঙ্গলমহলে। তখন জঙ্গলমহলে তৃণমূলের প্রবল প্রভাব। বিজেপির সংগঠনও ততটা শক্তিশালী নয়। কিন্তু শিক্ষকতা করতে করতেই এলাকায় মানুষের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে শুরু করেন ক্ষুদিরাম টুডু।
২০১৬ সালে প্রথমবার বিজেপি প্রার্থী হিসেবে
রানিবাঁধ কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে লড়ে পরাজিত হন
২০২১ সালেও আবার লড়াই করেন
সেবারও তৃণমূলের কাছে পরাজিত হতে হয় তাঁকে
তবে হাল ছাড়েননি। জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত এলাকায় ঘুরে ঘুরে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। এলাকার জল, রাস্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আদিবাসী উন্নয়ন- এই সমস্ত ইস্যুকে সামনে রেখে কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। অবশেষে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বড় জয় আসে তাঁর জীবনে। তৃণমূল প্রার্থী ডঃ তনুশ্রী হাঁসদাকে ৫২ হাজার ২৫৯ ভোটে হারিয়ে বিধায়ক নির্বাচিত হন ক্ষুদিরাম টুডু। শুধু জেতাই নয়, জঙ্গলমহলে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধির অন্যতম মুখ হিসেবেও উঠে আসেন তিনি।
তারপরই আরও বড় চমক। শুভেন্দু অধিকারীর নতুন মন্ত্রিসভায় জায়গা পান ক্ষুদিরাম টুডু। পাঁচ জন মন্ত্রীর মধ্যে অন্যতম তিনি। রাজনৈতিক মহলের মতে, জঙ্গলমহলের আদিবাসী ভোটব্যাঙ্কের প্রতি বিশেষ বার্তা দিতেই ক্ষুদিরাম টুডুকে মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দেওয়া হয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গলমহলের উন্নয়ন, আদিবাসী মানুষের অধিকার এবং গ্রামীণ সমস্যাকে সামনে রেখে রাজনীতি করেছেন তিনি।
তাঁর শপথ নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে বাগডুবি গ্রাম। গ্রামের মহিলারা বলছেন, “আমাদের গ্রামের ছেলে এত বড় জায়গায় পৌঁছেছে, এটা ভাবতেই ভালো লাগছে।” কেউ বলছেন, “মন্ত্রী হলেও উনি এখনও খুব সাধারণ।” আবার কেউ বলছেন, “এলাকার উন্নয়ন এবার আরও হবে।” স্থানীয়দের দাবি, ক্ষুদিরাম টুডু খুব সহজেই গ্রামের মানুষের সঙ্গে মিশে যান। মন্ত্রী হওয়ার পরেও তাঁর বাড়ির দরজা সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকবে বলেই আশা করছেন এলাকাবাসী। জঙ্গলমহলের মানুষ এখন তাকিয়ে রয়েছেন নতুন দায়িত্বে ক্ষুদিরাম টুডুর কাজের দিকে। বিশেষ করে আদিবাসী উন্নয়ন, শিক্ষা, রাস্তা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তিনি কী পদক্ষেপ নেন, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের। এক সময় যে ছেলে কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে স্কুলে যেত, আজ সেই মানুষই মহাকরণের পথে। বাগডুবির মাটির বাড়ি থেকে ব্রিগেডের শপথমঞ্চ- ক্ষুদিরাম টুডুর এই যাত্রা শুধু একজন নেতার রাজনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়, এটা জঙ্গলমহলের বহু সাধারণ মানুষের স্বপ্নপূরণের প্রতীকও।