ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জটিলতার জের, কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এবারেও থাকছে না বাংলাদেশি সিনেমা!
রিয়া হালদার, সাংবাদিক: দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের জের, ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও থাকছে না বাংলাদেশি সিনেমা। খবর তেমনই। টানা দু-বছর ধরে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশি ছবির অনুপস্থিতি দর্শকদের কাছে মনখারাপের একটা বিষয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই ঘটনার নেপথ্যে রাজনৈতিক কোনও কৌশল রয়েছে বলেই মনে করছেন দর্শকদের একাংশ। সত্যিই কি রাজনৈতিক কোনও কারণ নাকি অন্য কোনও বিষয়?

চলতি মাসের ৬ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। ২০২৩ পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশি চলচিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে জায়গা পেয়েছিল বাংলাদেশের ছবি, কিন্তু এবার তা হয়নি। এবছর ৩৯টি দেশ থেকে ২১৫টি ছবি প্রদর্শিত হবে। তালিকায় রয়েছে গুয়াতেমালা, প্যালেস্টাইন, কাজাখাস্তান,সৌদি আরব, কিউবা, সুদান, মিশর, আর্মেনিয়া, মরোক্কোর এবং ইরাকের মতো দেশ। কিন্তু জায়গা করতে পারেনি প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের নাম না থাকার নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক টানাপোড়েন। মনে করছেন অনেকেই।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সাল থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জটিল পরিস্থিতির সূত্রপাত। আর তা থেকেই চড়তে শুরু করে রাজনীতির পারদ। যতই সময় গড়িয়েছে পড়শি ২ দেশের সম্পর্ক আরও খারাপ দিকেই এগিয়েছে। তার কারণেই এবারের চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা পেল না বাংলাদেশি ছবি।

গত বছর ৩০তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে-এর চেয়ারম্যান ছিলেন পরিচালক গৌতম ঘোষ। তখনই তিনি এক সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ‘এ বছর কোনো বাংলাদেশি ছবি প্রতিযোগিতায় নেই। অনেক কিছুই এখন আটকে আছে। আশা করি আগামী বছর পরিস্থিতি বদলাবে। কিন্তু ২০২৫ সালেও পরিস্থিতি বদলায়নি। একই রয়েছে গেছে। এ বছর উৎসবের সূচি প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যায়, কোনো বিভাগেই বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের উপস্থিতি নেই। অথচ বাংলাদেশি পরিচালক তানবীর চৌধুরীর ‘কাফারা’ এই বছর আন্তর্জাতিক বিভাগে জমা পড়েছিল। কিন্তু ছবিটি তাদের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। তাই ছবিটি উৎসবে জায়গা পায়নি। খবর পাওয়া গিয়েছে।
২০২২ সালে, মহম্মদ কায়ুমের ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’ ছবিটি আন্তর্জাতিক বিভাগে সেরা ছবি হিসাবে ‘গোল্ডেন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছিল। তার পর কায়ুম দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের পথ আরও প্রশস্ত করার জন্য উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন যে পরবর্তীকালে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আরও বেশি করে বাংলাদেশি ছবি প্রদর্শিত হবে। কিন্তু তা হয়নি। তিনি বলেন, যদি কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসব বাংলা সিনেমাকে উৎসাহ না দেয়, তাহলে কে দেবে? এটা কি ছবির মানের জন্য, নাকি ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অন্যিদকে, ঢাকা থেকে পরিচালক শঙ্খ দাশগুপ্ত বলেছেন, চলচ্চিত্র উৎসবের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছবির বিষয়বস্তু ও কারিগরি দিককে মূল্যায়ন করা, অন্য কোনও বিবেচনা নয়। তিনি জানান, ‘আমরা জানতে চাই, কেন আমাদের সিনেমাগুলি কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসবে আর জায়গা পাচ্ছে না। কলকাতার অন্যতম বড় চলচ্চিত্র উৎসব হিসেবে কেআইএফএফ অর্থাৎ কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসব বরাবরই দুই দেশের শিল্প-সংস্কৃতির মিলনস্থল ছিল। তাই ২০২৫ সালের সংস্করণে বাংলাদেশি ছবির অনুপস্থিতি অনেকের কাছেই বেদনাদায়ক এবং উদ্বেগজনক বার্তা বহন করছে বলে মনে করছেন দর্শকরা।
কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকাররা যাই তথ্য তুলুক না কেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। গত এক বছর ধরে ভারতের সঙ্গে যে বিশ্বাসঘাতকতা বাংলাদেশ করে চলেছে তা তো আর অস্বীকার করা যায় না। যে ভারতের হাত ধরে একদিন ভূমিষ্ট হয়েছিল মুজিবের বাংলাদেশ, সেই কিনা বর্তমানে জঙ্গিমদতপুষ্ট পাকিস্তানের অঙ্গুলিহেলনে চলছে। প্রতিনিয়ত ভারতবিদ্বেষী মনোভাব বা বাংলাদেশের সংখ্যালঘু অত্যাচার তো গত একবছর ধরে গোটা বিশ্বই দেখছে। আমরা ভুলে যাইবা কী করে চিকেন নেক বা ভারতের সেভেন সিস্টার দখল করে নেওয়া নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মুখ্য উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসের পরোক্ষ হুমকি। এহেন পরিস্থিতে আগে দেশের গরিমা রক্ষা করাই ভারতবাসীর মুখ্য উদ্দেশ্য। বন্ধুত্বের সহবস্থান ঠিকঠাক থাকলেই ভাবা যাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বা কৃষ্টি ভারতের মাটিতে প্রদর্শিত হবে কিনা। আগে দেশাত্মবোধ, তারপর অন্যকিছু। তাই ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসবে বাংলাদেশি ছবির অনুপস্থিতির বিষয়টি খুব একটা আশ্চর্যের নয়।