মোজতবা খামেনেইকে সমর্থন পিয়ংইয়ং-এর

উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইকে নির্বাচিত করার করার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানায়।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার আকাশ যখন যুদ্ধের উত্তাপ। ঠিক সেই সময়েই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে এক নতুন সমীকরণ। সাম্প্রতিক সংঘাতের আবহে ইরানের পাশে প্রকাশ্যে দাঁড়ালেন উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার কিম জং উন। পিয়ংইয়ং শুধু তেহরানের নতুন নেতৃত্বকে সমর্থনই জানায়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সামরিক হামলারও তীব্র নিন্দা করেছে। ফলে ইরানকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই সংঘাত এখন ধীরে ধীরে বৈশ্বিক শক্তির অবস্থানকে স্পষ্ট করে তুলছে। উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইকে নির্বাচিত করার করার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানায়। তিনি বলেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণের নিজেদের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করা আন্তর্জাতিক সমাজের দায়িত্ব। ইরানের এক্সপার্টস অ্যাসেম্বলির মাধ্যমে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের ঘোষণাকে স্বীকৃতি জানিয়ে পিয়ংইয়ং জানায়, তেহরানের এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছে উত্তর কোরিয়া। তাদের দাবি, ইরানের ওপর চালানো সামরিক হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও একটি সার্বভৌম দেশের মর্যাদাকে লঙ্ঘন করেছে। এই মুখপাত্র বলেন, এই ধরনের আক্রমণ শুধু একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে না। বরং গোটা অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। তার মতে, এই হামলা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে ও এর ফলে বিশ্ব রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হন। সেই ঘটনার পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সংঘাতের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে উত্তর কোরিয়া ওই হামলাকে গ্যাংস্টারসুলভ আচরণ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছিল ও প্রকাশ্যে এর নিন্দা করেছিল। এই অবস্থান থেকেই এবার তারা ইরানের নতুন নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আবারও স্পষ্ট বার্তা দিল। একদিকে একই সময়ে উত্তর কোরিয়া নিজেদের সামরিক সক্ষমতার বার্তাও দিতে শুরু করেছে। সম্প্রতি কিম জং উনের উপস্থিতিতে দেশটির নতুন যুদ্ধজাহাজ চোয়ে হিয়ন ডেস্ট্রয়ার থেকে কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের সময় কিম বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং তা আরও শক্তিশালী করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক শক্তিই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ ক্ষমতা হিসেবে কাজ করতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার চেষ্টা করে আসছে। তবে পিয়ংইয়ংয়ের দাবি, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হুমকি মোকাবিলার জন্যই তাদের এই পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য কূটনৈতিক দিক থেকেও কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন আবারও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা শুরু করার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে কিম জং উনও ইঙ্গিত দিয়েছেন, যদি ওয়াশিংটন উত্তর কোরিয়াকে একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন পথে এগোতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পাশে কিম জং উনয়ের প্রকাশ্যে সমর্থন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ কূটনৈতিক মন্তব্য নয় বরং এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বড় রাজনৈতিক সংকেত। এমন অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতীকী হলেও এর প্রভাব প্রায়ই গভীর হয়। কারণ একটি দেশের বক্তব্য অনেক সময় বৃহত্তর রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিফলিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়ার মতো একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র যখন প্রকাশ্যে ইরানের পাশে দাঁড়ায় তখন বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকার নজরে আসে। ওয়াটিংশটন এই অবস্থানকে সতর্কতার সঙ্গেই পর্যবেক্ষণ করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

পিয়ংইয়ং বোঝাতে চাইছে যে পশ্চিমা শক্তির চাপের মুখে থাকা দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমর্থনের একটি অদৃশ্য সেতু তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত যদি আরও জটিল আকার ধারণ করে তাহলে এই ধরণের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরিকল্পনাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে। তাই অনেকের মতে, এই ঘটনাগুলো শুধু একটি অঞ্চলের সংঘাতের গল্প নয় বরং ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণের ইঙ্গিত যেখানে প্রতিটি দেশের অবস্থানই ভবিষ্যেতের বিশ্ব রাজনীতির নতুন করে পথরেখা আঁকতে শুরু করেছে।