কেন তিনি দক্ষিণ কলকাতার বাড়ি বিক্রি করে নিভৃতবাসে চলে গিয়েছিলেন। আলোকবর্তিকার মধ্যে থেকেও কেন নিভৃতবাসে কাটাতে হল এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : বেশ করেছি প্রেম করেছি করবোই তো। মৌচাকের এই বিখ্যাত গানটা মনে পড়লে কার মুখ ভেসে ওঠে বলুন তো। হ্যাঁ মিঠু মুখার্জীর। যিনি অনেকের কাছেই কলকাতার রেখা বলে পরিচিত ছিলেন। আবার অনেকেই বলতেন হেলেনের থেকেও পর্দায় সাহসী। মুম্বইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়াত সেই কলকাতার রেখা। তিলোত্তমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে তিনি চলে গিয়েছিলেন মুম্বইয়ে দিদির কাছে। আর সেখানেই নিভৃতে লড়াই করে গেছেন শরীরে বাসা বাঁধা মারণ রোগ ক্যানসারের সঙ্গে। কিন্তু সেই লড়াইটা শেষ হয়ে গেল রবিবার। কলকাতা যখন ঘুমিয়ে তখন চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিলেন মিঠু মুখার্জী। তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে অবসান হল একটা গোটা যুগের। কেন তিনি দক্ষিণ কলকাতার বাড়ি বিক্রি করে নিভৃতবাসে চলে গিয়েছিলেন। আলোকবর্তিকার মধ্যে থেকেও কেন নিভৃতবাসে কাটাতে হল এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে।
সাতের দশকের বাংলা সিনেমায় মিঠু মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতি ছিল একেবারে অন্যরকম। গোল চোখ , মিষ্টি হাসি আর সুন্দর চেহারার এক বাঙালি কন্যা। অনেক পুরুষ হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন অনায়াসে। কখনও সমিতভঞ্জ, তো কখনো সৌমিত্র কিংবা রঞ্জিত মল্লিক। সব নায়কের সঙ্গেই তিনি ছিলেন সাবলীল। এমনকি যে কোনও চিত্র তাঁর অভিনয়ে জীবন্ত হয়ে উঠতো। স্বয়ংসিদ্ধা, মর্জিনা আবদুল্লা, মৌচাক,সাতের দশকের একের পর এক হিট সিনেমায় তাঁর অভিনয় আজও সিনেপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন। নায়িকা হিসাবে তাঁর প্রধান ইউএসপি ছিল ক্যামেরার সামনে স্বতঃস্ফূর্ততা। মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রাণখোলা অভিনয় দেখতে অনেকেই হাপিত্যেশ করে বসে থাকতেন। কেউ বলেন রেখা কেউ বলেন সুচিত্রা সেনের সঙ্গে মিল রয়েছে মিঠু মুখার্জীর। জনপ্রিয়তা থাকার সত্ত্বেও তিনি নিজেকে আড়াল করে নিয়েছিলেন তাঁর অগুন্তি অনুরাগীদের থেকে। তিনি যেন নিজের চারিদিকে একটি দেওয়াল তুলে নিয়েছিলেন। কেন এই দূরত্ব তা এখনও অজানা। তিনি তো পারতেন অন্যান্য নায়িকাদের মতো জীবনকে সাজিয়ে তুলতে। এক দৃপ্তিময়ী ব্যক্তিত্বের অধিকারী তিনি। পর্দায় প্রেমিকা হিসাবে বহু পুরুষ মনে হিল্লোল তোলা নায়িকার ব্যক্তিগত জীবন ছিল একান্তই ব্যক্তিগত। তাঁর মনের অন্দরে কেউই সিঁধ কাটতে পারেনি।
১৯৭১-৭২ সাল নাগাদ চিত্র পরিচালকের হাত ধরে রুপোলি জগতে পা রেখেছিলেন মিঠু মিখার্জী। চিত্ত বসুর শেষ পর্ব ছবি দিয়ে তাঁর যাত্রাপথ শুরু হলেও ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন হন ১৯৭৩ সালে। দীনেন গুপ্তর মর্জিনা-আবদুল্লা ছবিতে নামভূমিকায় অভিনয় করার পর থেকে আর কোনওদিন পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই বাঙালি তনয়াকে। মনে আছে সেই গান মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ঝিঁটিয়ে বিদেয় কর, কিংবা হায় হায় প্রাণ যায় গানে মিঠু মুখার্জীর চাহুনি। ১৯৭৫ সালে শোলেতে হেলেনের মেহেবুবা গানে নাচ ও পোশাক কাত করেছিল বহু সিনেপ্রমীকে। কিন্তু ১৯৭৩ সালে মিঠু মুখার্জীর হায় হায় প্রাণ যায় গানের দৃশ্যায়ন যদি দেখেন তাহলে বুঝবেন সাদা-কালো সেলুলয়েডের ধুসর ক্যানভাসে রঙিন বসন্ত ছিলেন মিঠু মুখার্জী।

ভাবুন যে সময়ে সিনেমায় অভিনয় নিয়ে অনেকে বাঁকা চোখে দেখতেন তখন মিঠু মুখার্জী চরিত্রের জন্য যে কোনও পোশাকে ছিলেন সাবলীল। টানা টানা চোখ, মিষ্টি মুখ, চাবুকের মতো ছিপছিপে শরীর আর তুখোড় অভিনয়ের সম্মোহনে কুপোকাত হয়েছিলেন হাজার হাজার বাঙালি পুরুষ। যাঁর রূপের ছটা দেখে সেই সময় অনুরারাগীরা অনেকেই নাম দিয়েছিলেন কলকাতার রেখা। ১৯৭৪ সালে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী কমেডি ছবি মৌচাক। একদিকে উত্তম কুমার, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মতো মেগাস্টাররা, অন্যদিকে রঞ্জিত মল্লিকের বিপরীতে অভিনয় করে হাততালি কড়িয়েছেন মিঠু মুখার্জী। মহানায়ক উত্তম কুমারের বিপরীতেও নায়িকা হিসেবে চুটিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি; যার মধ্যে হোটেল স্নো ফক্স এবং চাঁদের কাছাকাছি অন্যতম।
বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে মুম্বইয়ের বলিপাড়াতেও নিজের দক্ষতার ছাপ ফেলেছিলেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। ১৯৭৬ সালে দুলাল গুহর খান দোস্ত ছবির মাধ্যমে হিন্দিতে আত্মপ্রকাশ করেন। পরবর্তীতে বাসু চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় দিললগি, সফেদ ঝুট, দো লাড়কে দোনো কাড়কের মতো বেশ কিছু হিন্দি ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসা পায়। মায়ানগরী মুম্বইয়ের ঝকমকে দুনিয়া থেকে তিনি আবার ফিরে আসেন কলকাতায়। মুম্বইয়ে চলে যাওয়ায় বাংলা ইন্ডাস্ট্রি ও সিনেমার সঙ্গে একটু দূরত্ব তৈরি হয়েছিল তাঁর। তাই পসার জমাতে সময় লাগে। কিন্তু তিনি তো ছেড়ে দেবার পাত্রী তিনি নন। ফের ঝড় তুললেন রূপোলি পর্দায়। হিট তাঁর অভিনিত ছবি আশ্রিতা। এরপরেই হঠাৎ করে তিনি যেন অন্তরালে চলে গেলেন। গ্ল্যামারের ঝকমকে আলো যখন মধ্যগগনে ঠিক তখনই তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন। ফিল্মবোদ্ধাদের অনেকেই বলেন,ভক্তদের হৃদয়ে তাঁর সৌন্দর্য আর অভিনয়ের স্মৃতিকে উজ্জ্বল রাখতেই তাঁর অন্তরালে চলে যাওয়া। তাই হয়তো তিনি যখন চির ঘুমের দেশে, আলোর পথযাত্রী তখনও চোখ বুজলেই ভেসে ওঠেন মৌচাকের সেই নীপা কিংবা মর্জিনা আব্দুলা সিনেমার মর্জিনা হয়ে। বাংলা সিনেমা হারাল আরও এক প্রতিভাবান অভিনেত্রীকে। না ফেরার দেশে ভালো থাকুন মিঠু মুখার্জী।