পুলিশের জালে অভিষেক ঘনিষ্ঠ নেতা

সুইসাইড নোটে নাম, চার বছর পর গ্রেফতার অভিষেক ঘনিষ্ঠ শিক্ষক নেতা মইদুল ইসলাম।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : ডায়মন্ড হারবারে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে তৃণমূলের শিক্ষক নেতা মইদুল ইসলামকে গ্রেফতার করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। মঙ্গলবার সকালে ডায়মন্ড হারবার থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। পুলিশ সূত্রে খবর, ২০২২ সালের একটি আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলার তদন্তে এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। পাশাপাশি, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি-সহ একাধিক অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। যদিও গোটা ঘটনাকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত শিক্ষক নেতা।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল মইদুল ইসলামের। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক সংগঠনের নানা কর্মকাণ্ডেও তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ফলে ডায়মন্ড হারবার-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক মহলে তাঁর প্রভাব ছিল বলেই মত স্থানীয়দের একাংশের।
তবে রাজনৈতিক উত্থানের পাশাপাশি একাধিক বিতর্কও ঘিরে ধরেছিল তাঁকে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে অতীতেও তদন্ত শুরু হয়েছিল। এমনকি একসময় তাঁর বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয় বলে সূত্রের খবর। তদন্তের স্বার্থে তাঁকে নজরদারিতেও রাখা হয়েছিল বলে দাবি তদন্তকারীদের।
পুলিশের দাবি, ২০২২ সালের একটি আত্মহত্যার ঘটনায় প্ররোচনার মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন মইদুল ইসলাম। জানা গিয়েছে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বোলসিদ্ধি কালীনগর পঞ্চায়েতের উপপ্রধান দেবব্রত ভট্টাচার্য ২০২২ সালে আত্মঘাতী হন। ঘটনার পর মৃতদেহের পাশ থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়েছিল বলে জানা যায়। সেই নোটে মইদুল ইসলামের নাম উল্লেখ ছিল বলে পুলিশ সূত্রে দাবি। এরপর থেকেই মামলাটি তদন্তাধীন ছিল। সম্প্রতি নতুন করে তদন্তে গতি আসে এবং একাধিক তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়।
তদন্তকারীদের দাবি, বিভিন্ন নথি, তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে নতুন করে মামলাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। সেই সূত্র ধরেই সোমবার মইদুল ইসলামকে আটক করা হয়। জানা গিয়েছে, বাইকে করে অন্যত্র যাওয়ার সময় হটুগঞ্জ এলাকা থেকে তাঁকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁকে ডায়মন্ড হারবার থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হয়। মঙ্গলবার তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত কয়েকদিনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও একাধিকবার দেখা গিয়েছিল মইদুল ইসলামকে। নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় সিজিও কমপ্লেক্সে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাজিরার দিনও তিনি তাঁর সঙ্গে ছিলেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। এছাড়াও কালীঘাটে অভিষেকের বাসভবনেও তাঁকে দেখা গিয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। ফলে এই গ্রেফতারিকে ঘিরে রাজনৈতিক জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে।
যদিও নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মইদুল ইসলাম। গ্রেফতারের পর তিনি দাবি করেন, তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ফাঁসানো হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, “আমাকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আমি তা করতে চাইনি। তাই রাজনৈতিকভাবে আমাকে চক্রান্ত করে ফাঁসানো হচ্ছে। আমি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছি। সেই কারণেই আজ আমাকে টার্গেট করা হচ্ছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, “শুভেন্দু অধিকারী আমাকে চেনেন, আমি কীভাবে আন্দোলন করি তিনি জানেন। যেভাবে একের পর এক তৃণমূল নেতাদের মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে, আমাকেও একইভাবে ফাঁসানো হয়েছে।”
অন্যদিকে, বিজেপির পক্ষ থেকে এই ঘটনায় ভিন্ন সুর শোনা গিয়েছে। ডায়মন্ড হারবার বিজেপি সাংগঠনিক জেলার সাধারণ সম্পাদক অতনু সাঁতরা অভিযোগ করেন, শিক্ষক সংগঠনের নাম করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, “মইদুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে গিয়েছেন। কখনও আক্রান্ত বলে দল করেছেন, কখনও আইএসএফ-এর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। ২০২২ সালের আত্মহত্যার মামলার তদন্ত এতদিন আটকে রাখা হয়েছিল। এখন তদন্ত শুরু হতেই পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। আইনের উপর আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।”
এই ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। একদিকে তৃণমূল শিবিরের একাংশ এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলছে, অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি—আইন আইনের পথেই চলছে। এখন আদালত ও তদন্ত প্রক্রিয়ার দিকেই নজর সকলের।