উত্তেজনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে পুলিশ ও কমিশনের ভূমিকা। তার মধ্যেই অন্যতম পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে প্রথম দফাতেই উত্তাপ। সকাল থেকেই বুথের সামনে লম্বা লাইন। হাতে ভোটার স্লিপ আর চোখে ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আশায় সাধারণ মানুষ। কিন্তু শুধু ভোটারদের উৎসাহ নয়, সমান্তরাল ভাবে শুরু রাজনৈতিক তরজা, অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের ঝড়। আর এই উত্তেজনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে পুলিশ ও কমিশনের ভূমিকা। তার মধ্যেই অন্যতম পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম। প্রথম দফার সবচেয়ে হাইভোল্টেজ কেন্দ্র, যেখানে প্রতিটি ভোট, প্রতিটি মুহূর্ত ঘিরে ছিল রাজ্য রাজনীতির তীক্ষ্ণ নজর।
বাংলায় প্রথম দফা নির্বাচনে ১৫২টি কেন্দ্রের মধ্যে বিশেষ নজরে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম। কম বেশি সকলের নজর এই কেন্দ্রের দিকে। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ শান্তিকুঞ্জ থেকে বেরোন নন্দীগ্রামের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। গাড়ি নেননি শুভেন্দু। ই-রিকশায় চেপে নিজের বুথে যান। ভোট দিতে বেরিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, সিপিএমের সময়ে পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন। ২০১১ সালেও এরকম প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা দেখেননি। কোনও কথা বোঝার দরকার নেই। সবাই পদ্মফুলে ভোট দেওয়ার জন্য তৈরি। রাজ্যের একশো শতাংশ মানুষ বদল চাইছেন। এমনকি শিক্ষিত মুসলিমরাও চাইছেন পরিবর্তন। ২০২১ সালে ৪০০ মুসলিম ভোট পেয়েছিলাম। এবার ৪০০০ বেশি মুসলিম ভোট পাব।
পথে ওই যতটা হয়, ততটাই ওই ব-কলমে জনসংযোগ সারেন শুভেন্দু অধিকারী। এদিন সকালে মন্দিরে পুজো দিয়ে ভোটদান কেন্দ্রে তিনি। হিন্দুদের একজোট থাকার বার্তাও দেন বিজেপি প্রার্থী। কিছুক্ষণের মধ্যে গ্রামের পথ ধরে পৌঁছে যান নন্দনায়কবাড় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এটাই তাঁর বুথ। এখানে প্রায় আধ ঘণ্টা ছিলেন শুভেন্দু। তার পরে ভোট দেন ।
ভোট দেওয়ার পর বুথ ছাড়েন শুভেন্দু অধিকারী। সেখান থেকে চলে যান নিজের কার্যালয়ে। ঘাঁটি গেড়ে বসেন। বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে ভোটের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনা সেরে নেন। আলাদা আলাদা খণ্ডচিত্ত। কিন্তু তাঁর বার্তা একটাই। ভোট দেওয়ার আগে এবং পরে একটা কথাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শুভেন্দু বলেন, পরিবর্তন চাই, পরিবর্তন আনুন।
এরপর একের পর এক বুথ পরিদর্শনে যান শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামের বিএমটি শিক্ষা নিকেতন ৭৭ ও ৭৮ নং বুথ, গড় চক্রবেড়িয়া ইরিগেশন ডাকবাংলো ২৩৭ নং বুথ নাকচিরাচর ২৪৩ নং বুথ পরিদর্শনে যান তিনি। গাড়ি থেকে নামতেই জয় শ্রীরাম স্লোগান দিতে থাকেন নন্দীগ্রামের বিজেপি প্রার্থী। আবার কোনও ক্যাম্পে বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে মাটিতে বসে মুড়ি ও ঝুড়ি ভাজা খেতে দেখা যায় তাঁকে।
ভোটের দিন নন্দীগ্রামে একদিকে যখন উঠে এল এই ছবি। তখন সেই নন্দীগ্রামেই ধরা পড়ল অন্য এক ছবি। ভীমকাটাতে শুভেন্দুর গাড়ি ঘিরে উঠল জয় বাংলা স্লোগান। শুভেন্দু অধিকারীকে দেখে আরও অন্য একাধিক স্লোগান দিতেও শোনা যায় বিরোধীদের। যদিও এসবে মেজাজ হারাননি নন্দীগ্রামের বিজেপি প্রার্থী। বরঞ্চ ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতিটা সামাল দেন তিনি।
নন্দীগ্রামের ভোট মানেই শুভেন্দুর সঙ্গে যার নাম উঠে আসে। মানে যার সামনেও এদিন ছিল সমান অগ্নিপরীক্ষা। তিনি হলেন তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র কর। বৃহস্পতিবার সকাল সকাল ভোট দেন তিনি। পবিত্র বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাই বাধ্যবাধকতা। সেই জায়গা থেকে ভোট দিলাম। এরপরের তাঁর কী কর্মসূচি, তাও জানান তিনি। বলেন, নন্দীগ্রামবাসীকে একটা জঞ্জাল থেকে মুক্ত করার জন্য সাধারণ মানুষ যেভাবে উৎসাহের সঙ্গে নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়েছেন, তাঁদের উৎসাহ দেওয়া।
প্রথম দফার ভোটের সকালে উত্তেজনা ছড়ায় নন্দীগ্রামে। একদিকে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে পুলিশি সক্রিয়তা নিয়ে নালিশ জানায় তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যদিকে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলায় পুলিশের বিরুদ্ধেই পক্ষপাতের অভিযোগে সরব হন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার সকালে সাংবাদিক বৈঠকে রীতিমতো বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন রাজ্যের বিদায়ী মন্ত্রী শশী পাঁজা। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রামে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা কয়েকজন পুলিশকর্মী সরাসরি বিজেপির হয়ে কাজ করছেন। তৃণমূলের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে দুই পুলিশ আধিকারিকের নামোল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনের কাছে নালিশ জানানো হয়।
তৃণমূল যখন নন্দীগ্রাম নিয়ে সরব, ঠিক তখনই পালটা আক্রমণ শানান শুভেন্দু অধিকারী। নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার পর তিনি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে পিংলা থানার ওসির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলেন। শুভেন্দুর দাবি, পিংলার বর্তমান ওসি চিন্ময় প্রামাণিক বিজেপির পোলিং এজেন্টদের বুথ থেকে বের করে দিচ্ছেন এবং শাসকদলকে মদত জোগাচ্ছেন। কড়া সুরে তিনি বলেন, পিংলার ওসিকে অবিলম্বে সাসপেন্ড করতে হবে। এই মর্মে তিনি খোদ মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে ফোন করে অভিযোগ জানান।
নন্দীগ্রামে শাসক ও বিরোধী, দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটের হার যথেষ্ট ভালো হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, নন্দীগ্রামের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগে যথেষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছেন। এখন নজর ফলাফলের দিকে , কার দখলে যাবে এই হাইভোল্টেজ কেন্দ্র, সেটাই দেখার।