সূচনা পল্যে, নিজস্ব সংবাদদাতা: নরেন্দ্র মোদী সরকার, আদানি গোষ্ঠী আর ভারতীয়দের কোটি কোটি টাকার জীবনবিমা- এই তিনটি শব্দ এখন উঠে আসছে একসঙ্গে এবং তা নিয়েই শুরু হয়েছে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক। সংসদে নিজেই স্বীকার করল কেন্দ্র- রাষ্ট্রায়ত্ত লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন বা LIC, আদানি গোষ্ঠীর নানা সংস্থায় মোট ৪৮,২৮৪ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে।

তাহলে প্রশ্ন উঠছে-
সাধারণ মানুষের সঞ্চয় কি ঝুঁকিতে? সরকার কি গোপনে কোনও কর্পোরেট গোষ্ঠীকে বাঁচাতে চাইছে? এর প্রভাব কি পড়তে চলেছে ভারতের অর্থনীতিতে?
সংসদে লিখিত প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানান- LIC আদানি গোষ্ঠীর বিভিন্ন কোম্পানিতে মোট বিনিয়োগ করেছে ৪৮,২৮৪.৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে- ৩৮,৬৫৮.৮৫ কোটি টাকা- ইকুইটি (শেয়ার) হিসেবে ৯,৬২৫.৭৭ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে।
এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে, LIC, Adani Ports and Special Economic Zone-এর সিকিউর্ড নন-কনভার্টিবল ডিবেঞ্চারে (NCD)
আরও ৫,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এই বিনিয়োগ হয়েছে ২০২৫ সালের মে মাসে। সরকারি বক্তব্য- এই বিনিয়োগ হয়েছে ”strict due diligence”, অর্থাৎ সমস্ত রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট ও নিয়ম মেনেই। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা।

কী বলছে বিরোধীরা?
এই বিষয়টি সংসদে তুলেছিলেন- কংগ্রেস সাংসদ মহম্মদ জাওয়েদ এবং তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। তাঁদের প্রশ্ন ছিল-আদানি গোষ্ঠী তদন্তের আওতায় থাকার পরেও কেন বিনিয়োগ? সরকার কি LIC-কে কোনও নির্দেশ দিয়েছে? সাধারণ পলিসিহোল্ডারদের টাকা কি ঝুঁকিতে পড়ছে? কেন বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলোর সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না?
এর উত্তরে সরকার বলেছে-
অর্থ মন্ত্রক বা DFS থেকে কোনও advisory বা direction দেওয়া হয়নি। LIC সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় IRDAI, RBI এবং SEBI-এর নিয়ম মেনে। কিন্তু সরকার একটি জিনিস প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছে। তা হলো-LIC কোন কোন বেসরকারি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছে তার পূর্ণ তালিকা। সরকারের যুক্তি- এই তথ্য প্রকাশ করা commercially prudent নয় অর্থাৎ ব্যবসায়িকভাবে ঠিক হবে না। এই ঘটনার ঠিক দুই মাস আগে, মার্কিন সংবাদমাধ্যম Washington Post একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের দাবি ছিল- ভারত সরকারের অর্থ মন্ত্রক,
Department of Financial Services, NITI Aayog এবং LIC মিলেমিশে আদানি গোষ্ঠীর জন্য একটি “রহস্য আর্থিক পরিকল্পনা” তৈরি করেছিল। রিপোর্টে বলা হয়- আদানি পোর্টস-এর ৫৮৫ মিলিয়ন ডলারের বন্ড ইস্যু LIC একাই ফাইন্যান্স করেছিল। অর্থাৎ, আদানির তহবিল সংকট মেটাতে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার টাকা ব্যবহার করা হয়েছে- এমনই অভিযোগ। সরকার অবশ্য এই রিপোর্ট পুরোপুরি অস্বীকার করেনি, আবার পুরোপুরি স্বীকারও করেনি।
রুপি ৯০- নতুন আতঙ্ক
এই বিতর্কের মধ্যেই এল আরও এক বড় ধাক্কা- ডলারের তুলনায় ভারতীয় রুপি প্রথমবার ৯০ টাকা ছুঁল। ৭৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম! এর মানে কী?
আমদানি খরচ বাড়বে পেট্রোল-ডিজেলে দাম বাড়ার সম্ভাবনা, সাধারণ মানুষের উপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ, বিদেশি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পিছনে কারণ- বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা, ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি, রাজনৈতিক ও কর্পোরেট অনিশ্চয়তা এবং বড় কর্পোরেট গোষ্ঠী নিয়ে বিতর্ক। এমন সময় যদি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার টাকা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে যায়, তাহলে বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
আজ কোটি কোটি সাধারণ মানুষ LIC-তে টাকা জমা রাখে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য- পেনশন, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা,বৃদ্ধ বয়স। কিন্তু যখন তারা শুনছে- যে টাকার উপর ভরসা করে তারা নিজেদের জীবন সাজাচ্ছেন, সেই টাকাই যাচ্ছে এক বিতর্কিত কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে- তখন স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে- রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কি জনগণের টাকা দিয়ে কর্পোরেট বাঁচানোর যন্ত্র হয়ে উঠছে না? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখনও অস্পষ্ট।
একদিকে সরকার বলছে- সব কিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি- এই বিনিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন- ভারতের সাধারণ মানুষ, যাঁদের কোটি কোটি টাকার সঞ্চয় জড়িয়ে রয়েছে LIC-এর সঙ্গে।