”মেকলে ভারতকে নিজের শিকড় থেকে তুলে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন”

“মেকলে ভারতের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিয়েছিলেন। আমাদের মনে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন বিদেশি পদ্ধতি গ্রহণ না করলে কিছুই অর্জন করা যায় না।”

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক দিল্লিতে একটি ভাষণ দিয়েছেন। এই ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি আক্রমণ করেছেন ব্রিটিশ চিন্তাবিদ থমাস ব্যাবিংটন মেকলে-কে, যাঁর ১৮৩৫ সালের শিক্ষানীতি ভারতীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি, আত্মবিশ্বাস এবং ভাষার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পরে কংগ্রেস সেই উপনিবেশিক মানসিকতা আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে।

ব্রিটিশ শিক্ষা নীতি এবং মেকলে

প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারতের শিক্ষা ধ্বংসে মেকলে-র ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন-“ মেকলে ভারতকে নিজের শিকড় থেকে তুলে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি এমন এক শ্রেণি তৈরি করতে চেয়েছিলেন যারা ভারতীয় হয়েও আচরণ করবে ব্রিটিশের মতো।”

১৮৩৫ সালে ম্যাকলের ‘মিনিট অন এডুকেশন’ অনুযায়ী ইংরেজি ছিল প্রধান শিক্ষার ভাষা। পশ্চিমা সাহিত্য, বিজ্ঞান এবং চিন্তাধারা গুরুত্ব পেল, আর ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা- গুরুকুল, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, সংস্কৃতি- সবকিছু পিছনে পড়ে গেল।

মোদী অভিযোগ করেন- “মেকলে ভারতের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিয়েছিলেন। আমাদের মনে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন বিদেশি পদ্ধতি গ্রহণ না করলে কিছুই অর্জন করা যায় না।”

স্বাধীনতার পরেও বদল হল না মানসিকতা

মোদী বলেন, স্বাধীনতার পরেও নেতারা এই চিন্তাভাবনা বদলালেন না। বরং তা আরও শক্তিশালী হলো।

“ভারতের শিক্ষা, অর্থনীতি এবং সমাজ- সবকিছুই বিদেশি মডেলের দিকে ঝুঁকে গেল। ভারতীয় জ্ঞানব্যবস্থা ধীরে ধীরে উপেক্ষিত হলো।”

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন- ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থায় শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন এক সমাজ তৈরি হল

ভারতীয় ভাষা পিছনে পড়ল

‘আমদানি করা সবকিছুই ভালো’-এই বিশ্বাস মাথায় গেঁথে গেল

গান্ধীর স্বদেশি দর্শন হঠাৎ উপেক্ষিত

মোদীর মতে- “স্বদেশি দর্শন, যা মহাত্মা গান্ধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি করেছিলেন, স্বাধীনতার পর গুরুত্ব হারিয়ে গেল।” ভারত বিদেশি মডেল, বিদেশি শাসনব্যবস্থা এবং বিদেশি উদ্ভাবনকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করল। মানুষ বিশ্বাস করতে লাগল- আমদানি করা জিনিসই উন্নত, দেশি জিনিস দ্বিতীয় শ্রেণির।

কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ

মোদীর বক্তব্য শুধু ইতিহাসে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করেন- “মাওবাদী এবং আরবান নকশালদের জন্ম দিয়েছে কংগ্রেস। যারা দেশের সংবিধানকেও অস্বীকার করেছিল, তারা আজ বিভিন্ন রাজ্যে পৌর কাউন্সিলর হয়ে বসে আছে।” তিনি এনডিএ-র বিহার নির্বাচনে জয়লাভের পর ঘন্টা কয়েকের মধ্যেই এই মন্তব্য করেন। যা ভাষণের রাজনৈতিক তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেয়।

রামনাথ গোয়েঙ্কার সাংবাদিকতা উদাহরণ

মোদী সাংবাদিক রামনাথ গোয়েঙ্কার নির্ভীকতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান-“১৮৩৫ সালে, ১৮৫৭-র বিদ্রোহের অনেক আগে, গোয়েঙ্কা লিখেছিলেন- ব্রিটিশ নিয়মে চলতে হলে আমি পত্রিকা বন্ধ করে দেব। সেই লড়াইয়ের মনোবলই আজ দরকার।” মোদীর বক্তব্যের সুর ছিল- যেভাবে গোয়েঙ্কা কলম দিয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, তেমনভাবে আজ মানসিক দাসত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।

পর্যটন ও ঐতিহ্য উদাহরণ

মোদী বলেন-“যে দেশে পর্যটন উন্নত হয়েছে, সেখানে মানুষ নিজের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে। ভারত ঠিক বিপরীত পথে চলেছে। স্বাধীনতার পর আমাদের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার চেষ্টা হয়েছে।” তার বক্তব্য- ঐতিহ্যের প্রতি গর্ব না থাকলে সংরক্ষণ হয় না। সংরক্ষণ না হলে স্থাপত্য ও ইতিহাস কেবল পাথর-ইটের ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়।

ভাষার প্রশ্ন- ইংরেজি নয়, সমর্থন ভারতের ভাষায়

মোদী স্পষ্ট করে বলেন- সরকার ইংরেজির বিরুদ্ধে নয়, তারা ভারতীয় ভাষাগুলোর গুরুত্ব বৃদ্ধি করতে চায়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন- “জাপান, চীন, কোরিয়া- পশ্চিমা প্রযুক্তি নিলেও ভাষায় আপস করেনি।” নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) তাই স্থানীয় ভাষায় শিক্ষার উপর জোর দিচ্ছে।

২০৩৫- একটি প্রতীকী লক্ষ্য বর্ষ

মোদীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা- “১৮৩৫ সালে মেকলে ভারতের শিক্ষার মেরুদণ্ড ভেঙেছিলেন। ২০৩৫-এ সেই ঘটনার ২০০ বছর পূর্ণ হবে।” তাই- “আগামী দশ বছরে ভারতকে সেই দাস মানসিকতা থেকে মুক্ত করতে হবে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা এবং জ্ঞানব্যবস্থার ভিত ফের শক্তিশালী করতে হবে।”

যুদ্ধ এখন কলম ও আত্মবিশ্বাসে

শেষে মোদী বলেন- “যে লড়াই রামনাথ গোয়েঙ্কা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কলম দিয়ে লড়েছিলেন, আজ সেই লড়াই মানসিক শৃঙ্খল ভাঙার। আজ আমাদের অস্ত্র- শিক্ষা, উদ্ভাবন ও আত্মবিশ্বাস।” মোদীর বক্তব্যে স্পষ্ট- ভারতের সংস্কৃতি, ভাষা ও শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের পথিকৃত হবেন সাধারণ মানুষই। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দশকে ভারত নিজের পরিচয়, আত্মবিশ্বাস এবং জ্ঞানব্যবস্থার পুনর্নির্মাণ করবে- এই প্রত্যাশাই তিনি দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।