ধোপেও টিকলো না “মহাগটবন্ধন”, নীতীশই মুখ্যমন্ত্রী
রিমা দত্ত, সাংবাদিক : এনডিএর ঝড়ে উড়ল মহাজোট। নিভল আরজেডির লন্ঠন। ফিনিক্স পাখির মতো বিহারের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন হল নীতীশ কুমারের। নীতীশের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে এক্কেবারে মুখ থুবড়ে পড়ল বিহারের মহাজোট মহাগঠবন্ধন। ম্যাজিক ফিগার পেরিয়ে একেবারে দুই তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠটা পেল এনডিএ। ভোটের আগে প্রশান্ত কিশোর দাবি করেছিলেন, “বিহারে পঁচিশের বেশি আসন পাবে না জেডিইউ। নীতীশ কুমার আর মুখ্যমন্ত্রী হবেন না।” তেজস্বী যাদব বলেছিলেন, “নীতীশবাবু অসুস্থ। তাঁকে চালনা করছেন বিজেপির উচ্চবর্ণের নেতারা।” এমনকী ভোটের পর তাঁর দল ভেঙে যাবে বলেও তাকে কটাক্ষ করছিলেন কেউ কেউ। নীতীশ ফিনিশ। কিন্তু বিহার বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলের ইঙ্গিত প্রকাশ্যে আসার পরই দেখা গেল নীতীশ ফিনিশ নন, বরং ফিনিক্স। নীতীশ ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গেল মহাগঠবন্ধন।
বিহারে লোকমুখে ঘুরছিল সলমনের সিনেমার নাম। লাগানো হয়েছিল বড় পোস্টার। তাতে লেখা, টাইগার আবি জিন্দা হ্যায়। ভাবছেন, কেন বলছি। না না এটা কোনও সিনেমার প্রচার নয়, এই কথা বলা হচ্ছে বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর জন্য। বিহারে ভোটের ফলাফলের আগে গোটা বিহার জুড়ে নীতীশ কুমারের নামে পোস্টার পড়ে। তাতে লেখা ছিল টাইগার আবি জিন্দা হ্যায়। পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ নীতীশ কুমার। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বিগত ২০ বছর ধরে তিনি রয়েছেন। অনেকেই এবারের নির্বাচনের আগে বলতে শুরু করেছিলেন যে এটাই হয়তো নীতীশের শেষ নির্বাচন। তাঁর স্বাস্থ্য ঘিরে নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে ৭৪ বছরে এসেও নীতীশ কুমার বুঝিয়ে দিলেন, “টাইগার আবি জিন্দা হ্যায়”।

বিহারে পাল্টু কুমার, থুড়ি নীতীশ কুমার মুখ্যমন্ত্রিত্ব ধরে রাখার জন্য তিনি কখনও এনডিএ, কখনও গঠবন্ধন জোটে নাম লিখিয়েছেন। শেষবার শিবির বদলের পর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর কখনও এই ভুল করবেন না। জোট বদল করবেন না। তবে তিনি যদি জেতেন এবার তিনিই দশমবার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করবেন।
২০ বছর ধরে কুরসিতে থাকার প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, প্রকাশ্যে একের পর এক অসংলগ্ন আচরণের ভিডিও ভাইরাল হওয়া। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করা ভোটের পাঁচ-ছ’মাস আগেও নীতীশ কুমারকে নিয়ে বিহারে বাজি ধরবেন এ হেন কেউ ছিলেন না। কিন্তু শেষ ছ’মাসে কী এমন করলেন বিহারের এই পাল্টু কুমার, যে সব সমীকরণ বদলে গেল? রয়েছে একাধিক ফ্যাক্টর।
জাতপাত ও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতিতে ক্লিষ্ট বিহারে নীতীশ কুমার নিজস্ব একটি মহিলা ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করেছেন। ২০০০ সালে ক্ষমতায় এসেই মহিলা ভোটারদের মন পেতে মন দেন নীতীশ।

প্রথম কাজ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ঠিক করা।বিহারে একটা সময় মেয়েদের সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে বেরনো আতঙ্কের কারণ ছিল। সেখানেই তিনি ধীরে ধীরে দুষ্কৃতীরাজ দমন করার চেষ্টা করলেন।
শুরু হল মহিলা শিক্ষায় জোর মেয়েদের প্রগতির জন্য সাইকেল দেওয়া। সরকারি প্রকল্পে মহিলাদের সাহায্য করা। স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীগুলিকে উৎসাহিত করা,‘জীবিকা দিদি’ তৈরি করা।
বিহারের মহিলাদের জীবন অনেকাংশে বদলে দিয়েছে নীতীশের সুরাবন্দি। বিহারে সুরাবন্দির ফলে গার্হস্থ্য হিংসা, সংসারে অশান্তি কমেছে। সংসারে কমেছে অভাব অনটন। তবে এই সুরাবন্দি পুরনো ইস্যু। তাতে এবার নতুন করে সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল না নীতীশের। এখানেই আসরে চলে এলেন প্রশান্ত কিশোর। তিনি ঘোষণা করলেন বিহারে ক্ষমতায় এলে মদ ফের চালু হবে। তেজস্বী যাদব আবার বলে গেলেন, ক্ষমতায় এলে তাড়ি বৈধ করা হবে। ভয় পেলেন বিহারের মহিলারা। আরও একজোট হল নীতীশের ভোটব্যাঙ্ক।
ভোটের আগে নীতীশের মাস্টারস্ট্রোক মহিলাদের অ্যাকাউন্টে সোজা ১০ হাজার টাকা করে পাঠানো। যে মহিলা ভোটব্যাঙ্ককে তিনি দীর্ঘদিন ধরে লালন-পালন করে এসেছিলেন, সেই মহিলারা এবার প্রতিদান দিল। ভোটের হারে দেখা গেল পুরুষদের থেকে অনেক এগিয়ে মহিলা ভোটার। শুধু তাই নয়, মোট ভোটের সংখ্যাতেও এই প্রথমবার পুরুষদের ছাপিয়ে গেল প্রমিলাবাহিনী। ধর্ম, জাত, বর্ণ সামাজিক সমীকরণ সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে নীতীশকে সমর্থন করলেন মহিলারা।

চিরাগ পাসওয়ান এনডিএ-তে যোগ দেওয়ায় দলিত, মহাদলিত, ওবিসি, ইবিসি এবং স্ববর্ণদের ভোট দিয়ে দুর্দান্ত জাত সমীকরণ তৈরি হয়েছিল। যার পালটা দেওয়া সম্ভব হয়নি মহাজোটের পক্ষে।
তবে বিহারের যুব সমাজের একটা বড় অংশ রুজিরুটি না পেয়ে নীতীশের উপর খাপ্পা। আবার এটাও সত্যি সেই খাপ্পা ভোটারদের ফিরে পেতে শেষবেলায় মাসে হাজার টাকা, দক্ষতা উন্নয়নের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণের মতো প্রকল্প শেষ ছ’মাসে ঘোষণা করেছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী। ফলে যুবসমাজের ভোট যতটা ছিটকে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, ততটা যায়নি।
বিজেপি বারবার বলেছে, বিহারে তাঁরা ভোটে লড়বেন নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে। কিন্তু ভোটের পর কি তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রী করা হবে? একবারও বলেননি অমিত শাহরা। উলটে তাঁরা বলে গিয়েছেন, ভোটের পর বিধায়করা ঠিক করবেন কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন। ফলে নীতীশের যারা কোর ভোটার, তাঁদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল জেডিইউয়ের থেকে বিজেপি বেশি আসন পেয়ে গেলে হয়তো বিজেপি নিজেদের মুখ্যমন্ত্রী করতে চাইবে। ঠিক যেমনটা হয়েছিল মহারাষ্ট্রে। সেই আশঙ্কা থেকেই এককাট্টা হয়ে ভোট দিয়েছেন নীতীশের ভোটাররা। এদের একটা বড় অংশ ২০২০ সালে হয় ভোট দেয়নি, নয়তো চিরাগ পাসওয়ানকে ভোট দিয়েছিল। ২০ বছর ধরে যে ভাবমূর্তি নীতীশ তৈরি করেছেন সেটা এবার কাজে লাগল। আসলে নীতীশ নিজে এবারের ভোটে দুর্দান্ত প্রচার করেছেন। কোনও বিতর্কে জড়াননি, নীরবে প্রচার করে গিয়েছেন। বিজেপির কাছে মাথা নোয়াননি। জুনিয়র পার্টনার হতে চাননি। নিজের পছন্দের প্রার্থী হওয়া নিয়ে আপস করেননি। নীরবে সভা করে গিয়েছেন। তাছাড়া এটাই নীতীশের শেষ ভোট সেই আবেগও কাজে লেগেছে।

জনমত সমীক্ষার পরেই পাটলিপুত্রের আকাশে জমা হয়েছিল আশা-আশঙ্কার মেঘ। অধিকাংশ সমীক্ষা নীতীশ কুমারকে ফের বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসিয়েছিল। তাতে মহাগটবন্ধনের মাথায় চিন্তার মেঘ জমা হলেও দু-একটি সমীক্ষা আশার আলো জ্বালিয়েছিল। কিন্তু তাতেও ঢাললো জল। শুক্রবার সকাল ৮টা থেকেই শুরু হয় বিহারে ভোট গণনা। ভোট বাক্স খুলতেই প্রথম দফার গণনা থেকেই জয়জয়কার এনডিএর। বিপুল জয়ের আভাস পেতেই পাটনায় উচ্ছ্বাস দেখা যায় বিজেপি শিবিরে। ব্যান্ড পার্টি সঙ্গে চলে দেদার লাড্ডু বিলি। বিহারে এসআইআরের পরই প্রথম ভোট বলা যেতে পারে এসআইআরের অ্যাসিড টেস্টের পরই বিপুর ভোটে বাজিমাত করল এনডিএ। খড়কুটোর মতো উড়ে গেল মহাগঠবন্ধন। ভোটযুদ্ধে পিছিয়ে রইল লালু প্রসাদের দুই পুত্রই। এক সংখ্যার ঘরেই আটকে থাকল কংগ্রেস। বামেদের থেকেও কম আসন পেল কংগ্রেস।
বিহারে গত বিধানসভা নির্বাচনে যে দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠা লাভ করেছিল, এ বার তার করুণ দশা। এক থেকে একেবারে তিন নম্বরে চলে যেতে চলেছে লালু প্রসাদ যাদব, তেজস্বী যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল। রেকর্ড ভোটে জিতে ক্ষমতায় বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট, সৌজন্যে নীতীশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড (জেডিইউ)। তবে বিজেপি একক ভাবেও অনেকটা এগিয়ে রইল বিহারে। মহাগঠবন্ধনে অবশ্য আরজেডি-ই খানিকটা লড়াই চালিয়ে গেছে। কংগ্রেস একেবারেই দাগ কাটতে পারেনি। এনডিএ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জাদুসংখ্যা অনেক আগেই পেরিয়ে যায়। ২৪৩ আসনের বিহার বিধানসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন হয় ১২৩টি আসন। তা অনেক আগেই পেরিয়ে যার এনডিএ। কিন্তু কেন এই হার, তার মধ্যেও লুকিয়ে আছে নানা কারণ, প্রথম থেকেই নামেই ‘মহাগটবন্ধন’, ভোট ঘোষণার পরও আসনরফা নিয়ে চলে টানাটানি। প্রথম দিকে বিহারে আলাদা ভাবেই প্রার্থী ঘোষণা করে কংগ্রেস, আরজেডি, আপ, সিপিআই-সহ ইন্ডিয়া জোটের দলগুলি। শুরু হয়, ‘মহাগটবন্ধন’ ভার্সেস ‘মহাগটবন্ধন’। বিরোধী পক্ষের এই ফাটলেই সুযোগ নেয় নীতীশের দল। বিহারের মানুষও বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি। তাই হয়ত বিহারে জায়গাই পেল না কংগ্রেস। ঝুলিতে ভোটও কমল আরজেডির। অতএব, বিহারে ‘পঁচিশ সে তিরিশ, ফির সে নীতীশ।