SIR বিতর্কে সুপ্রিম কোর্টে বড় শুনানি,  চাপে নির্বাচন কমিশন?

ভোটার তালিকায় একটি নাম থাকা মানে শুধু একটি নাম থাকা নয়,এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন নাগরিকের ভোটাধিকার, তাঁর গণতান্ত্রিক পরিচয় ও দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা। আর সেই ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া অর্থাৎ বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর ঘিরে যখন একের পর এক প্রশ্ন উঠছে, তখন সেই বিতর্কই এবার পৌঁছে গেল দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য এবং নতুন ভোটারদের জন্য ব্যবহৃত ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন। সব মিলিয়ে সোমবার সুপ্রিম কোর্টের শুনানি ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন করে আলোচনা। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আদালত এখনও কোনও অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য বলে মেনে নেয়নি। বরং কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে জবাব চেয়ে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার পথে এগিয়েছে শীর্ষ আদালত।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক

সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চে এই সংক্রান্ত মামলাগুলির শুনানি হয়। বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনা। মামলাকারীদের তরফে অভিযোগ করা হয়, এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই কমিশনারের সম্মতি ছাড়াই নেওয়া হয়েছিল। একইসঙ্গে ফর্ম ৬-এ যে অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র যুক্ত করা হয়েছিল, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। মামলাকারীদের দাবি, এই পরিবর্তনের ফলে নতুন ভোটারদের কাছ থেকে এমন কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে আইনি বৈধতা এবং প্রক্রিয়াগত অনুমোদনের প্রশ্ন উঠেছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ফর্ম ৬।


নতুন ভোটাররা ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এই ফর্ম ব্যবহার করেন SIR চলাকালীন অনলাইন ফর্ম ৬-এ একটি অতিরিক্ত ঘোষণার অংশ যুক্ত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ সেখানে আবেদনকারীকে জানাতে বলা হয়েছিল, আগের এসআইআরের সময় তাঁর নিজের নাম, তাঁর বাবা-মা কিংবা দাদা-দিদা বা নানা-নানির নাম ভোটার তালিকায় ছিল কি না এই অতিরিক্ত তথ্য চাওয়ার বিষয়টি নিয়েই বিতর্ক তৈরি হয় বিশেষ করে প্রশ্ন ওঠে, বিধিবদ্ধ ফর্মে এমন পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এখানেই সোমবার সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আদালত স্পষ্ট করে দেয় পরিবর্তিত ফর্ম ৬-কে সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন করেনি। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, পরিবর্তিত ফর্ম ৬-কে বা কারা পরিবর্তন করেছে সেই বিষয়টি আদালত নথিপত্র দেখে জানতে চায় অর্থাৎ, এখন আদালতের সামনে মূল প্রশ্নগুলির একটি হল, এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কোথা থেকে এসেছিল ও তার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না।

এই প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় সামনে আসে। কয়েকদিন আগে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী এসআইআর ও ফর্ম ৬ সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তদন্তমূলক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক মাসে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে দুই কমিশনার একাধিকবার আপত্তি নথিভুক্ত করেছিলেন। ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন নিয়েও তাঁদের আপত্তির কথা প্রকাশিত হয়। এই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রাখা দরকার। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য হল, বিভিন্ন বিষয়ে কমিশনারদের মতপার্থক্য থাকাটা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার অংশ ও গত এক বছরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মত ছিল।

আর সেই কারণেই সুপ্রিম কোর্ট সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরাসরি কোনও চূড়ান্ত নির্দেশ দিতে রাজি হয়নি। শুধুমাত্র সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে আদালত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কিন্তু একইসঙ্গে আদালত জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির কাছ থেকে জবাব নেওয়া হবে এবং নথিপত্র খতিয়ে দেখা হবে। যদি আদালত দেখতে পায় যে কোনও সিদ্ধান্তে আইন মানা হয়নি, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ থাকবে। সোমবারের শুনানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। মামলাকারীদের তরফে শুধু ফর্ম ৬ নিয়ে নয়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাজের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, কমিশনের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অন্য দুই কমিশনারের সম্মতি ছাড়াই নেওয়া হয়েছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কিছু সিদ্ধান্ত বাতিল করার পাশাপাশি তদন্তের দাবিও করা হয়েছে। এমনকি জ্ঞানেশ কুমারকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার আবেদনও করা হয়েছিল। কিন্তু সোমবার সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে সাসপেন্ড করার বিষয়ে কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয়নি।

বরং আদালত এখন কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে চেয়েছে। নোটিস জারি করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই তদন্তমূলক অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এসআইআরের মতো একটি বড় নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে দেশের বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম ও ভোটাধিকার জড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যেই নির্বাচন কমিশন গত সেপ্টেম্বরের শেষে জানিয়েছিল, এসআইআর শেষ হয়ে যাওয়া রাজ্যগুলিতে ECINET পোর্টালে ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত এসআইআর ঘোষণাটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এসআইআরের বাইরে ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে Registration of Electors Rules, ১৯৬০ অনুযায়ী প্রযোজ্য ফর্ম ব্যবহার করা হবে।

এখন প্রশ্ন হল, আদালত পরবর্তী শুনানিতে কী জানতে পারে? পরিবর্তিত ফর্ম ৬ -কে অনুমোদন করেছিল? সেই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না? নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি সত্যিই সর্বসম্মত ছিল কি না? আর যদি কোনও সিদ্ধান্তে আইন বা নির্ধারিত প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তার আইনি পরিণতি কী হতে পারে। এই প্রশ্নগুলিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাহলে এখন নজর থাকবে সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী শুনানি এবং কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের জবাবের দিকে। ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তর কীভাবে সামনে আসে সেটাই এখন দেখার।