প্রয়াত মনি শংকর মুখার্জী

শংকরের সাহিত্য বড় পর্দায় নতুন জীবন পায়, কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিত রায়ের হাত ধরে। তাঁর উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিত রায় নির্মাণ করেন- সীমাবদ্ধ, জন-অরন্য।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : সাহিত্য-সংস্কৃতির আকাশে নক্ষত্রপতন। প্রয়াত বর্ষীয়ান সাহিত্যিক মনি শংকর মুখার্জী। যাঁকে বাঙালি পাঠক শংকর নামে চেনে। শুক্রবার দুপুরে ৯২ বছর বয়সে, এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বিভিন্ন বয়সজনিত অসুখে ভুগছিলেন তিনি।

‘চৌরঙ্গী’, ‘কত অজানারে’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’- যে কলম আমাদের শহরকে নতুন করে চিনিয়েছে, মানুষের অন্তর্লোক উন্মোচন করেছে, সেই কলম আজ স্তব্ধ। কিন্তু থেমে যায়নি তাঁর সৃষ্টি। ভবিষ্যতেও থামবে না তাঁর প্রভাব।


১৯৩৩ সালে বনগাঁয় জন্ম শংকরের
শৈশবের কিছুটা সময় কাটে সেখানেই
পরে পরিবার চলে আসে হাওড়ায়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি আক্রমণের আশঙ্কায় পরিবার ফেরে বনগাঁয়। কিন্তু কিশোর শংকর থেকে যান বাবার সঙ্গে। স্বাধীনতার বছরেই নেমে আসে জীবনের প্রথম বড় আঘাত- পিতৃবিয়োগ। যা সম্বলহীন এক কিশোরের সামনে কঠিন বাস্তব হয়ে ওঠে। সংসার চালাতে তিনি অফিসের কেরানির কাজ থেকে শুরু করে গৃহপরিচারকের কাজ এমনকি হকারিও করেছেন। জীবন তাঁকে খুব অল্প বয়সেই সংগ্রাম করতে শিখিয়েছিল।

সাহিত্য জীবনের সূচনা

রিপন কলেজে পড়ার সময় তিনি কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ফ্রেডরিক বারওয়েলের কাছে কাজ নেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর প্রথম উপন্যাস- কত অজানারে। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত এই বই তাঁকে রাতারাতি পরিচিত করে তোলে। অল্প বয়সেই এমন পরিণত লেখনী দেখে পাঠক বিস্মিত হয়। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।

চৌরঙ্গী: এক কালজয়ী সৃষ্টি

সদ্য স্বাধীন কলকাতার সাহেবপাড়ার জীবন, হোটেল সংস্কৃতি, মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সাফল্য-ব্যর্থতা- সব মিলিয়ে জন্ম নেয় চৌরঙ্গী। এই উপন্যাস শুধু জনপ্রিয় হয়নি, মাইলফলক হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যে। ২০১২ সাল পর্যন্ত এর ১১১তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে- যা বিরল কৃতিত্ব। এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র, যেখানে স্যাটা বোসের চরিত্রে অভিনয় করেন মহানায়ক উত্তম কুমার।

সত্যজিৎ রায় ও চলচ্চিত্র জগৎ

শংকরের সাহিত্য বড় পর্দায় নতুন জীবন পায়। কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিত রায়ের হাত ধরে। তাঁর উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিত রায় নির্মাণ করেন- সীমাবদ্ধ, জন-অরন্য। শংকর একবার বলেছিলেন -“সত্যজিৎই আমাকে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।” ঋত্বিক ঘটকও ‘কত অজানারে’ নিয়ে ছবি করার কথা ভেবেছিলেন। অর্থাৎ সাহিত্য ও চলচ্চিত্র- দুই জগতেই তিনি সমান স্বীকৃত।

লেখনভঙ্গি ও ভাবনার বিস্তার

শংকর কেবল জনপ্রিয় লেখক নন। নিজস্ব লেখনভঙ্গি বারবার ভেঙেছেন তিনি। সত্তরের অশান্ত কলকাতাকে কেন্দ্র করে লিখেছেন- ‘স্থানীয় সংবাদ’, ‘সুবর্ণ সুযোগ’। ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা, মানবজীবনের গভীর প্রশ্ন- সবেতেই তাঁর বিচরণ। বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও দর্শন নিয়ে তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থ দীর্ঘদিন বেস্টসেলার তালিকায় ছিল।

স্বীকৃতি ও পুরস্কার

২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘একা একা একাশি’ উপন্যাসের জন্য তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পান। অনেকের মতে, এই স্বীকৃতি দেরিতে এসেছিল। ‘চৌরঙ্গী’-র মতো সৃষ্টি করেও মূল ধারার তথাকথিত কৌলিন্যের স্বীকৃতি সহজে পাননি। কিন্তু পাঠকের ভালোবাসাই ছিল তাঁর আসল পুরস্কার।

সর্বভারতীয় লেখক

বাংলা ভাষাতেই লিখে, একান্ত বাঙালি জীবনানুভব নিয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন সর্বভারতীয় সাহিত্যিক। ভাষার সীমানা পেরিয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে।

শংকরের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন- বাংলা সাহিত্য জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল। শংকর আমাদের শিখিয়েছেন- শহর শুধু রাস্তা আর ভবন নয়, মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম, ভাঙন আর আলো-ছায়ার গল্প। আজ তিনি নেই। কিন্তু কলকাতার চৌরঙ্গীর আলো-ছায়ায়, অফিসকক্ষের নিঃসঙ্গতায়, মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভেতর- তিনি রয়ে যাবেন। শব্দের মধ্যেই তাঁর অমরত্ব। ব্যুরো রিপোর্ট আর প্লাস নিউজ।