টেক্সাসের তৈল শোধনাগারে বিস্ফোরণের ঘটনায় আতঙ্ক। এই বিস্ফোরণের নেপথ্যে ইরানের হাত থাকতে পারে।

শুভাশিস দাস, সাংবাদিক : হরমুজ় প্রণালীতে ইরানের বাধা নির্মূল করতে বড় পদক্ষেপের ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে ৪৮ ঘণ্টা সময়সীমা বেঁধে দিয়ে শনিবার জানিয়েছিলেন, যদি তারা হরমুজ় প্রণালী খুলে না দেয়, তবে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে। কিন্তু সোমবার সেই ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগেই ট্রাম্প জানালেন, ইরানের কোনও বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগামী পাঁচ দিন হামলা হবে না! ঘটনাচক্রে, ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা এবং হুমকিতে দমেনি ইরান। রবিবার তারাও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছিল আমেরিকাকে। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে আমেরিকা পরিচালিত বহু তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা, তৈল শোধনাগার এবং পানীয় জল পরিশোধন সংস্থাও রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে সেগুলিকেও নিশানা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল মোজ়তবা খামেনেই-মাসুদের দেশ। তেহরানের কথায়, আমেরিকা যদি ইরানের শক্তি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিতে হামলা চালায়, আমরাও চুপ করে বসে থাকব না। পশ্চিম এশিয়ায় ওদের যত তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র, শক্তিকেন্দ্র, পানীয় জল শোধনকেন্দ্র আছে সেগুলিকে নিশ্চিহ্ন করা হবে।
চাপানউতরের এই আবহে ট্রাম্পের পিছু হটার নেপথ্যে গোপন রণকৌশল রয়েছে কি না, তা নিয়ে সোমবার থেকেই নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। কারণ, কয়েকটি পশ্চিমী সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের তেল সাম্রাজ্যের রাজধানী খার্গ দ্বীপ দখলের উদ্দেশ্যে ৫ হাজারেরও বেশি বিশেষ প্রশিক্ষিত সেনা পাঠিয়েছে পেন্টাগন। ইতিমধ্যেই রওনা হয়ে গিয়েছে ওই বাহিনী। শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে আরও এফ-৩৫ লাইটিং-২ যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছেন ট্রাম্প। ফলে আদৌ তেহরানের আস্ফালনে ওয়াশিংটন কর্ণপাত করেছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
এই হুমকি এবং পাল্টা হুমকি এবং পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক সংঘাতের আবহে টেক্সাসে আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তৈল শোধনাগারে বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ছিল যে চারপাশের মাটি কেঁপে ওঠে। আগুন ধরে যার পুরো শোধনাগারটিতে। ভয়ংকর সেই ঘটনার একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সোশাল মিডিয়ায়। যুদ্ধের মাঝেই মার্কিন জ্বালানি তেলের ঘাঁটিতে এই ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে এর নেপথ্যে কি ইরানের হাত?

জানা গিয়েছে, স্থানীয় সময় অনুযায়ী সোমবার ৭টা ২২ নাগাদ ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। এরপরই দেখা যায় দাউদাউ করে জ্বলছে টেক্সাসের পোর্ট আর্থারের ভ্যালেরো এনার্জি করপোরেশনের তেল শোধনাগারটি। টেক্সাস উপসাগরীয় উপকূল ও টেক্সাস-লুইজিয়ানা সীমান্তের কাছে অবস্থিত ভ্যালেরো শোধনাগারটিতে প্রায় ৭৭০ জন কর্মী কাজ করেন। প্রতিদিন এখানে প্রায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার ব্যারেল পেট্রোল, ডিজেল ও জেট জ্বালানি উৎপাদন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিস্ফোরণ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ঘরবাড়ির কাঁচের জানালা ভেঙে পড়ে। ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় গোটা এলাকা। দমকল বিভাগের তরফে জানানো হয়েছে, কী কারণে এই বিস্ফোরণ তা এখনও স্পষ্ট নয়। স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে খবর, বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, পোর্ট আর্থার, গ্রোভস এবং নেদারল্যান্ডে তার প্রভাব পড়ে। গোটা ঘটনার তদন্ত চলছে। পাশাপাশি যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আগুন নেভানোর কাজ চলছে।
বিস্ফোরণের কিছু সময় পর পোর্ট আর্থার কর্তৃপক্ষের জরুরি বিভাগ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে শোধনাগারটির আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের উদ্দেশে বলা হয়, ভ্যালেরোর তেল শোধনাগারে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের পরিপ্রেক্ষিতে শোধনাগারটির আশাপাশের এলাকার বাসিন্দাদের যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। শোধনাগারটির সংলগ্ন সব এলাকার বাসিন্দাদের ওপর এই নির্দেশ প্রজোয্য। তবে কী কারণে এই বিস্ফোরণ ঘটল তা এখনও স্পষ্ট নয়। পশ্চিম এশিয়ার সামরিক সংঘাতের আবহে টেক্সাসের এই তৈল শোধনাগারে বিস্ফোরণের ঘটনায় আতঙ্ক বেড়েছে। পাশাপাশি বাড়তে শুরু করেছে জল্পনাও। দাবি করা হচ্ছে, এই বিস্ফোরণের নেপথ্যে ইরানের হাত থাকতে পারে। জল্পনা আরও ঘনীভূত হচ্ছে, কারণ বিস্ফোরণের নেপথ্য কারণ এখনও মার্কিন প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট করা হয়নি। কড়া নিরাপত্তা, নিখুঁত অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা সত্ত্বেও এতবড় বিস্ফোরণে কপালে ভাঁজ পড়েছে স্থানীয় প্রশাসনের। যদিও এ বিষয়ে তৈল শোধনাগার কর্তৃপক্ষের তরফ থকে কোনও বিবৃতি জারি করা হয়নি। তবে সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এমনিতেই আংশিক ‘অবরুদ্ধ’ হরমুজ় প্রণালী। ফলে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হয়েছে। অনেক দেশেরই পণ্যবাহী জাহাজ আটকে রয়েছে সমুদ্রপথে। বাকিদের জন্য জলপথ খুলে দিতে আগ্রহী হলেও আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলকে এই ছাড় দিতে রাজি নয় তেহরান। হরমুজ় প্রণালীর পর এ বার ইরান পারস্য উপসাগরও ‘বন্ধ’ করার হুঁশিয়ারি দেওয়ায় নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে ইরানের প্রতিরক্ষা পরিষদ সতর্ক করেছে, পারস্য উপসাগর বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। সেই করিডরে মাইন পাতা হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হবে। ইরান আরও জানিয়েছে, এ ধরনের মাইন সহজে অপসারণ করা সম্ভব হবে না।
ঘটনা যাই হোক না কেন ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু করার আগে বুঝতেই পারেনি ইরান এতটা বেগ দেবে। মোজ়তবা খামেনেই বা পেজেকশিয়ান বদ্ধ পরিকর ট্রাম্পকে বুঝিতে দিতে তাদের দেশের নাম ইরান। এরই ফাঁকে ইরানে সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে কি দায় এড়াচ্ছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প? নিজেই এই প্রশ্ন উস্কে দিলেন তিনি। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের দিকে কার্যত যুদ্ধের দায় ঠেললেন তিনি। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে পিটই তাঁকে ঠেলে দিয়েছিলেন বলে দাবি করলেন ট্রাম্প।