সমালোচকদের মন্তব্য, “এই মন্তব্য শুধু ভারতকেই অপমান করেনি বরং ভারতীয় নাগরিকদের অবদানকেও ছোটো করেছেন।”

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে যেন বিতর্কের শেষ নেই। মনে হয় উনি নিজেই চান না বিতর্ক থেকে না সরতে। তিনি যায়ই করেন তাই যেন বিতর্ক হয়ে যায়। বিতর্ক আর ট্রাম্প যেন একে অপরের পরিপূরক। এমনই আবার এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেল মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। তিনি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে একটি পুরানো রেডিও পডকাস্টের ভিডিও শেয়ার করতেই তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয় ভারত-সহ আন্তর্জাতিক মহলে। ওখানে ভারতকে হেলহোল সঙ্গে তুলনা করা হয়। এককথায় হেলহোল শব্দটির অর্থ নারকীয়। এবং ট্রাম্পের কথায় ভারত একেবারে হেলহোল। যা ঘিরেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত স্যাভেজ নেশন নামের একটি পডকাস্টকে কেন্দ্র করে। এই পডকাস্ট চিঠির আকারে ট্রথ সোশ্যাল-এ পোস্ট করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক মাইকেল স্যাভেজ আমেরিকার জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে দাবি করেন, আমেরিকায় কোনও শিশু জন্মালেই নাগরিকত্ব পেয়ে যায়। তারপর সেই পরিবার চিন, ভারত বা পৃথিবীর অন্য কোনও হেলহোল থেকে আত্মীয়দের নিয়ে আসে। শুধু তাই নয়, ভারতীয় ও চিনা নাগরিকদের ল্যাপটপ হাতে গ্যাংস্টার বলেও উল্লেখ করা হয়। সেই বক্তব্য-সহ চিঠিটি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার পরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে এমন অপমানজনক মন্তব্যকে কেন সামনে আনলেন ট্রাম্প?
এই ঘটনার পর ভারতে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে প়ড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক মহল। সব জায়গাতেই শুরু হয় নিন্দার ঝড়। সমালোচকদের মন্তব্য, এই মন্তব্য শুধু ভারতকেই অপমান করেনি বরং ভারতীয় নাগরিকদের অবদানকেও ছোটো করেছেন। বিশেষ করে আমেরিকার প্রযুক্তি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসাক্ষেত্রে ভারতীয়দের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রেক্ষিতে এই মন্তব্য অত্যন্ত আপত্তিকর বলে মনে করা হচ্ছে। গোটা বিষয়টি নিয়ে বিরোধী বিরোধী শিবির এবং সংবাদমাধ্যম উত্তাল। কিন্তু সাংবাদিক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে তেমন কড়া জাবাব দিতে দেখা যায়নি বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে। তিনি শুধু বলেন, আমরা এমন কিছু রিপোর্ট দেখেছি। এটুকুই আপাতত বলতে চাইছি।
বিতর্ক বাড়তেই পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নামেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ভারতের প্রতি ইতিবাচক বার্তা দিয়ে মার্কিন দূতাবাসের তরফে জানানো হয় ট্রাম্প নিজেই ভারতকে একটি মহান দেশ বলে উল্লেখ করেছেন এবং ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিজের বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যদিও এই ব্যাখ্যায় বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি। বরং অনেকের মতে, এটি ছিল ক্ষোভ প্রশমনের কূটনৈতিক চেষ্টা মাত্র। অবশ্য রণধীর জায়সওয়াল রাতে জানান, মার্কিন দূতাবাসের জারি করা পরবর্তী বিবৃতিও দেখেছি। মন্তব্যগুলো স্পষ্টতই কুরুচিকর। তিনি আরও জানান, এই ধরনের বক্তব্য ভারত-মার্কিন সম্পর্কের প্রকৃত বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। কারণ দুই দেশের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা এবং অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।

এই ইস্যুতে বিরোধী দল কংগ্রেসও কেন্দ্রীয় সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নেতার এমন মন্তব্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের আরও জোরালো অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গের প্রশ্ন, মোদীজির প্রিয় বন্ধু নমস্তে ট্রাম্প একটি নোট পোস্ট করেছেন, যার ভাষা অত্যন্ত অপমানজনক। এখানে মোদীজি নীরব। বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র বলছেন, এটা এখানেই ছেড়ে দিতে চাইছি। এখানে মোদীজি কিসের ভয় পাচ্ছেন। কংগ্রেস নেতা মনীশ তিওয়ারির বক্তব্য, মুখপাত্রের অন্তত এটুকু বলা উচিত ছিল যে ভারত নরক কুণ্ড নয়, পাঁচ হাজার বছরের প্রচীন সভ্যতা। কংগ্রেসের নেতারা দাবি করেন, দেশের সম্মান নিয়ে কোনও আপস করা যায় না। ভারতকে অপমান করলে তার কড়া জবাব দেওয়া উচিত। কেন্দ্রের নীরবতা কেন, সেই প্রশ্নেরই উত্তর চায় দেশ। ওই পোস্টে শুধু ভারত নয় চিনের দিকেও আঙুল তোলা হয়েছে। বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্যের জন্য কুখ্যাত এই ব্যক্তি তথা মাইকেল স্যাভেজ দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসাবেই পরিচিত। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের শুরুতে তিনি প্রথম এই চিঠি প্রকাশ্যে এনেছিলেন। তা এবার স্বয়ং ট্রাম্প নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডলেই পোস্ট করেছেন।