মহাকাশে চাঁদের কারখানা

পৃথিবী পাবে দ্বিতীয় চাঁদ?

নাজিয়া রহমান, নিজস্ব সংবাদদাতাঃ মহাকাশে হয়ে চলেছে একের পর এক চাঁদের সৃষ্টি। সম্প্রতি  মহাশূন্যের এই রহস্য খুঁজে বের করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। যা অবাক করার মতোই বলে মত তাঁদের। আর এই রহস্য ধরা পড়েছে ২০২১ সালে মার্কিন গবেষণা সংস্থা নাসার মহাকাশে পাঠানো জেমস্‌ ওয়েব টেলিস্কোপে। এই ক্যামেরাতেই ধরা পড়েছে একাধিক চাঁদ সৃষ্টির রহস্য।

 পৃথিবীর একটি মাত্র উপগ্রহ চাঁদ। এই চাঁদ সৃষ্টির কোন আদিকালে পৃথিবীর সঙ্গে বৃহৎ মহাজাগতিক পাথরখণ্ডের ধাক্কায় তৈরি হয়েছিল বলে মত বৈজ্ঞানিকদের । আামাদের এই উপগ্রহটি  শান্ত, নিশ্চুপ, মায়াবী।  কিন্তু এই পৃথিবী থেকে ৬২৫ আলোকবর্ষ দূরে অনবরত এমন শত শত চাঁদ তৈরি হয়ে চলেছে! যা প্রায অজানা ছিল বিজ্ঞানীদের কাছে।  মহাশূন্যের এ এক গূঢ় রহস্য। সম্প্রতি তা খুঁজে বার করেছেন আমেরিকার বিজ্ঞানীরা। প্রায় ৬২৫ আলোকবর্ষ দূরে একটি গ্রহের চারপাশে ঘুরছে প্রকাণ্ড গোলাকার এক চাকতি বা ডিস্ক । আর জ্যোতির বিজ্ঞানীদের মত, এখান থেকেই একের পর এক নাকি উপগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ভাষা অনুযায়ী  একেই বলা হচ্ছে চাঁদ তৈরির কারখানা। আর এই গ্রহটির নাম দেওয়া হয়েছে সিটি চ্যা বি। রহস্যে ভরা মহাকাশ। প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে রহস্য সেই রহস্যের উদ্ঘাটনে এবং মহাশূন্যের খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে ২০২১ সালে মার্কিন গবেষণা সংস্থা নাসা মহাকাশে পাঠিয়েছিল জেমস্‌ ওয়েব টেলিস্কোপ। আর সেই টেলিস্কোপেই ধরা পড়ছে মহাকাশের একাধিক রহস্যময় রূপ। আর এই জেমস্‌ ওয়েব টেলিস্কোপে ধরা পড়েছে একাধিক চাঁদ তৈরির রহস্য। আর জেম্‌স ওয়েব টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া তথ্য  থেকে সিটি চ্যা বি এই গ্রহ এবং তার চাকতি নিয়ে গবেষণা চলছে। আর এই ঘবেষণায় উঠে আসছে একের পর এক নতুন হদিস যা  বিজ্ঞানীদের কৌতূহলকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই  রহস্যময় চাকতি সংক্রান্ত প্রথম রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছিল চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে।নাসার অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্যাল জার্নাল লেটার্‌স-এ এই গ্রহটি সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট গ্রহটি যে নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে সেটির মাত্র ২০ লক্ষ বছর আগে  জন্ম হয়েছে। অর্থাৎ মহাকাশীয় হিসেবে দেখতে গেলে এই গ্রহটি শিশু। তবে বিজ্ঞানীদের এটাও মত এই নক্ষত্রটির সঙ্গে অবশ্য রহস্যময় সেই গোলাকার চাকতির সম্পর্ক নেই। চাকতিটির সঙ্গে নক্ষত্রের দূরত্ব ৪.৬ হাজার কোটি মাইল। তবে এখনও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। তাহলে চাঁদ তৈরির রহস্যটা কি? কিভাবে একটি চাকতিতে একটারপর একটি চাঁদ বা উপগ্রহ  তৈরি হয়ে চলেছে? আর এগুলিকে কেন উপগ্রহ বলা হচ্ছে কেই বা গ্রহ বলা হচ্ছে না? এ সংক্রান্ত বিষয়ে বিজ্ঞানী ওয়াশিংটনের সিয়েরা গ্র্যান্ট। যিনি একজন কারিগরী বিজ্ঞানী (Astronomer), যিনি বর্তমানে কার্নেগি সায়েন্স-এ পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত  এবং জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সাহায্যে  দূরবর্তী গ্রহের চারপাশের গ্যাস ও ধূলিকণার চাকতি নিয়ে গবেষণা করছেন। যার অনুমান নতুন চাঁদ তৈরি হতে পারে  এবং এ নিয়ে  সম্প্রতি তিনি এবং তাঁর দল প্রমাণ পেয়েছেন।  তিনি বলেন, ‘‘আমরা চাকতি আর তার সঙ্গী গ্রহটিকে দেখতে পাচ্ছি। এই প্রথম আমরা দেখতে পাব, কী ভাবে উপগ্রহ তৈরি হয়। এর নেপথ্যে রসায়নটা এই প্রথম আমরা বুঝতে পারব। আমরা তো শুধু চাঁদের সৃষ্টি দেখছি না, দেখতে পাচ্ছি গ্রহটির গঠনও। দেখতে পাচ্ছি গ্রহ আর উপগ্রহ তৈরিতে কী কী উপাদান লাগছে।’’

Illustration of the solar system, showing the paths of the eight major planets as they orbit the Sun, plus the asteroids and comets. The four inner planets are, from inner to outer, Mercury, Venus, Earth and Mars. The four outer planets are, inner to outer, Jupiter, Saturn, Uranus and Neptune.

অন্য দিকে বিজ্ঞানীদের মতে এই উপগ্রহ সৃষ্টি  সংক্রান্ত জেম্‌স ওয়েবের পাঠানো তথ্যে বিশেষ কয়েকটি অণুর উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁরা এ বিষয়ে গবেষণা শুরু করেছেন তাঁরা। গবেষণায় যেটা উঠে এসেছে অণু ছিল ওই গোলাকার চাকতির ভিতরে। যদিও এই তথ্য দিয়ে  সংশ্লিষ্ট গ্রহটিকে পর্যবেক্ষণ করা বা তার তথ্য সংগ্রহ করা সহজ নয়। কারণ,  ওই গ্রহটির কাছের নক্ষত্রের আলোয় গ্রহের সঙ্কেত চাপা পড়ে যাচ্ছে। তবে অণুর উপস্থিতি টের পাওয়ার পরেই বিজ্ঞানীরা ওই গ্রহ এবং চাকতির তথ্য সংগ্রহের জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে নক্ষত্রের আলো ঢেকে দিয়ে গ্রহের তথ্য আয়ত্তে আনেন তাঁরা। বিজ্ঞানী   গ্র্যান্ট জানিয়েছেন, ‘‘গ্রহের কাছাকাছি আমরা কিছু অণু দেখতে পাই। তখনই বুঝেছিলাম, ওখানে কিছু একটা চলছে। তার পর প্রায় এক বছরের চেষ্টায় আমরা তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছি।’’

 এখন প্রশ্ন গোলাকার চাকতিতে কি পাওয়া গেছে? এই গোলাকার চাকতিতে অ্যাসিটিলিন, বেঞ্জিন-সহ মোট সাতটি কার্বন সমৃদ্ধ অণুর সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা । যা নিকটবর্তী নক্ষত্রের রসায়নের সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ, ওই নক্ষত্রের চারপাশে জলের অণু পাওয়া গিয়েছে। কার্বন একেবারেই অনুপস্থিত! বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বৈপরীত্য ২০ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ফসল। আবারও প্রশ্ন ৬২৫ আলোকবর্ষ দূরের চাঁদের উৎস আমাদের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ? কেনই বা এটিকে নিয়ে চলছে বিজ্ঞানীদের  চুলচেরা বিশ্লেষণ?  এনিয়ে বিজ্ঞানীদের বক্তব্য,  যে এই সৌরজগতে কিভাবে উপগ্রহ তৈরি হচ্ছে তা জানা একান্ত প্রয়োজন। কী ভাবে এই উপগ্রহগুলি আসছে? উপাদান কী? কী প্রক্রিয়ায় কাজ চলছে? কতটা সময় লাগছে? তা জানা অতি-আবশ্যক বলে মত বিজ্ঞানীদের। আর বিজ্ঞানীদের এ বিষয়ে সাহায্য করছে নাসার জেম্‌স ওয়েব টেলিস্কোপ।