মরক্কোর স্বপ্ন থেমে গেল কোয়ার্টার ফাইনালেই!

কিলিয়ান এমবাপে ও উসমান দেম্বেলের জোড়া আঘাতে ২-০ ব্যবধানে জিতে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে গেল ফ্রান্স।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ফুটবল কখনও শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। কখনও এটি প্রতিশোধের গল্প, কখনও ইতিহাসের পুনর্লিখন, আবার কখনও অসমাপ্ত স্বপ্নের নির্মম পরিসমাপ্তি। বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন অনেক ম্যাচ আসে যেখানে স্কোরলাইন শুধু দুটি সংখ্যার হিসাব রাখে। কিন্তু মাঠের ঘাসে ছড়িয়ে থাকে আবেগ, অপেক্ষা, ব্যর্থতা ও গৌরবের অগণিত গল্প। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হৃদয়ভাঙা হারের স্মৃতি বুকে নিয়ে আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সামনে দাঁড়িয়েছিল মরক্কো। অ্যাটলাস লায়ন্স-এর সামনে ছিল ইতিহাস বদলে দেওয়ার সুযোগ। ফুটবলের সেই অদৃশ্য জাদুবাক্সে লেখা রইল একই পরিণতি। কিলিয়ান এমবাপে ও উসমান দেম্বেলের জোড়া আঘাতে ২-০ ব্যবধানে জিতে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে গেল ফ্রান্স। আর মরক্কোর স্বপ্ন থেমে গেল কোয়ার্টার ফাইনালেই।

এই লড়াই শুধু দুই ফুটবল দলের ছিল না। মাঠের বাইরেও ফ্রান্স ও মরক্কোর সম্পর্ক বহন করে দীর্ঘ পোস্ট-কলোনিয়াল ইতিহাস। অভিবাসন নীতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন যেমন তৈরি হয়েছে। তেমনই পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে মরক্কোর সার্বভৌমত্বকে সমর্থন জানিয়ে সম্পর্কের বরফও কিছুটা গলিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। ফলে বিশ্বকাপের এই ম্যাচে ফুটবলের পাশাপাশি ইতিহাস, রাজনীতি ও আবেগ সবকিছুরই এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব হিসাব ছাপিয়ে কথা বলেছে শুধু ফুটবল। ম্যাচে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দেয় ফ্রান্স। এমবাপে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে এবং দেজিরে দুয়ের নেতৃত্বে একের পর এক আক্রমণে মরক্কোর রক্ষণকে চাপে ফেলে দেয় দিদিয়ের দেশঁর দল। ফরাসিদের সামনে যেন একাই প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনো। একের পর এক অসাধারণ সেভ করে তিনি ফ্রান্সকে হতাশ করতে থাকেন। ২৫ মিনিটে আশরাফ হাকিমির কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে এমবাপেকে পাস বাড়ান দেজিরে দুয়ে। দ্রুত বক্সে ঢুকে পড়তেই তাঁকে ফাউল করেন নৌসের মাজরাউই। দীর্ঘ তিন মিনিটেরও বেশি সময় ধরে ভিএআরে রিপ্লে দেখার পর পেনাল্টির সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। স্পটকিক থেকে এমবাপের নেওয়া দুর্বল শট অনায়াসে আটকে দেন বোনো। বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারের এমন পেনাল্টি নষ্ট হওয়ায় অবাক হয়ে যায় গোটা স্টেডিয়াম।

এরপরও আক্রমণের ধার কমায়নি ফ্রান্স। দেম্বেলের একাধিক প্রচেষ্টা অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, আবার দেজিরে দুয়ের শক্তিশালী শট ফিরিয়ে দেন বোনো। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে লুকাস ডিগনের দূরপাল্লার দুরন্ত শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। অন্যদিকে কাউন্টার অ্যাটাক নির্ভর ফুটবল খেলতে থাকা মরক্কোও ব্রাহিম দিয়াজকে সামনে রেখে কয়েকবার সুযোগ তৈরি করেছিল। উইলিয়াম সালিবার নেতৃত্বে ফরাসি রক্ষণ ছিল দুর্ভেদ্য। প্রথমার্ধের শেষ দিকে আশরাফ হাকিমির ফ্রি-কিকও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। বলের দখলে ৬৩ শতাংশ আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও গোলশূন্য অবস্থায় বিরতিতে যায় দুই দল। প্রথম ৪৫ মিনিটের নায়ক ছিলেন নিঃসন্দেহে ইয়াসিন বোনো। বিরতির পর যেন সম্পূর্ণ অন্য এক ফ্রান্সকে দেখা গেল। শুরু থেকেই আক্রমণের গতি ও তীব্রতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় ‘লে ব্লুজ’। অবশেষে ৬০ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত গোল। তিন মরক্কো ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে বক্সের বাইরে থেকে বাঁক খাওয়ানো দুর্দান্ত শটে বোনোকে পরাস্ত করেন কিলিয়ান এমবাপে। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল তাঁর অষ্টম গোল এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসে মোট ২০তম গোল অবদান। এই গোলের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই আরও একবার আঘাত হানে ফ্রান্স। ৬৬ মিনিটে মাইকেল অলিসের নিখুঁত পাস থেকে এমবাপের ওয়ান-টাচ সেট-আপ কাজে লাগিয়ে ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে নিচু শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন উসমান দেম্বেলে। এই বিশ্বকাপে এটি ছিল তাঁর পঞ্চম গোল।

দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও হাল ছাড়েনি মরক্কো। আশরাফ হাকিমি, আজেদিন উনাহি, এল আইনাউইরা বারবার আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত গোলের দেখা মেলেনি। ফ্রান্সের রক্ষণ ছিল অত্যন্ত সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী। ৭৭ মিনিটে গোড়ালিতে সামান্য চোট পাওয়ায় এমবাপেকে তুলে নেন কোচ দিদিয়ের দেশঁ। সেমিফাইনালের আগে কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি তিনি। পরে এমবাপে নিজেই জানান, চোট গুরুতর নয় এবং তিনি ভালো আছেন। ম্যাচ শেষে হাসিমুখে দর্শকদের শুভেচ্ছাও গ্রহণ করেন ফরাসি তারকা।
ম্যাচ জিতলেও এমবাপের পেনাল্টি মিস নিয়ে সন্তুষ্ট নন দেশঁ। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ভিএআর রিভিউ চলায় এমবাপের ছন্দে প্রভাব পড়েছিল। যদিও সেটাকে অজুহাত হিসেবে দেখাতে চাননি ফরাসি কোচ। অন্যদিকে এমবাপে জানিয়েছেন, একটি পেনাল্টি মিস নিয়ে পড়ে থাকার কোনও মানে নেই। দলের জয়ই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সুর শোনা যায় উসমান দেম্বেলের গলাতেও। নিজের গোল নিয়ে খুশি হলেও তিনি স্বীকার করেছেন, মরক্কোর বিরুদ্ধে ফ্রান্স আরও ভালো খেলতে পারত। দলের লক্ষ্য এখনও একটাই বিশ্বকাপ জয়।

অন্যদিকে, ইয়াসিন বোনোর পারফরম্যান্স বিশেষ প্রশংসার দাবিদার। স্কোরলাইন ২-০ হলেও তাঁর অসাধারণ গোলকিপিং না থাকলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত। মরক্কোর ফুটবলারদের চোখেমুখে ছিল হতাশা। কিন্তু সেই হতাশার মধ্যেও ছিল লড়াই করে হারার গর্ব। এবার সেমিফাইনালে ফ্রান্সের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ স্পেন। কোয়ার্টার ফাইনালে যেভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে ফরাসিরা তাতে তাদের থামানো যে কোনও দলের কাছেই কঠিন পরীক্ষা হতে চলেছে। অভিজ্ঞতা, গতি, আক্রমণভাগের ধার এবং বড় মঞ্চে চাপ সামলানোর ক্ষমতা সব দিক থেকেই তারা শিরোপার অন্যতম দাবিদার।

চার বছর আগের ক্ষত সারানোর স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছিল মরক্কো কিন্তু ভাগ্যের জাদুবাক্সে আবারও লেখা হল ফ্রান্সের নাম। আর সেই জয়ের আলোয় আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল ‘লে ব্লুজ’। এখন তাদের চোখ একটাই আর মাত্র দুটি জয়। তারপরই বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণ হয় কি না তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে বিশ্বকাপের পরবর্তী ম্যাচেই।