ইরানের প্রাক্তন সামরিক মস্তিষ্ক মহম্মদ আলি জাফারি ও তাঁর উদ্ভাবিত প্রতিরক্ষা কৌশল মোজাইক ডিফেন্স। বহু বছর আগে পরিকল্পনা করা এই কৌশলই আজ ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রে মাঝেমধ্যেই এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন শক্তির হিসাব নতুন করে লিখতে হয়। পশ্চিম এশিয়ার আকাশে যখন ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র আর যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা যাচ্ছে তখন অনেকেই ভেবেছিল এই তো শেষ এবার। বিশ্ব সবচেয়ে শক্তিশালী সামরির শক্তি আমেরিকা ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইজরায়েলের যৌথ আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে কতক্ষণই বা টিকতে পারে ইরান ? ওয়াশিংটন ও তেল আভিভের কূটনৈতিক ভাষণে তখন আত্মবিশ্বাসের ঝলক যেন কয়েক দিনের মধ্যেই তেহরানের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তব ছবিটা অন্য কথা বলছে। টানা হামলা, ড্রোন আঘাত, উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের মৃত্যু এত কিছুর পরও ইরান ভেঙে পড়েনি। বরং আগের মতোই দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্ন উঠছে কী সেই শক্তি যে শক্তি আমেরিকার মতো পরাশক্তির চাপের মুখেও একটি রাষ্ট্রকে এতটা স্থির রাখতে পারে?
আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে ইরানের প্রাক্তন সামরিক মস্তিষ্ক মহম্মদ আলি জাফারি ও তাঁর উদ্ভাবিত প্রতিরক্ষা কৌশল মোজাইক ডিফেন্স। বহু বছর আগে পরিকল্পনা করা এই কৌশলই আজ ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে। এই ধারণার মূল কথা অত্যন্ত সহজ। কিন্তু কার্যকারিতায় বিস্ময়কর। দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কখনওই একটি কেন্দ্র বা একক নেতৃত্বের উপর নির্ভরশীল হবে না। বরং গোটা সামরিক কাঠামোকে ছড়িয়ে দেওয়া হবে অসংখ্য ছোট ছোট ইউনিটে। ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী, নৌবাহিনী, স্থলবাহিনী প্রত্যেকটি ইউনিট নিজ নিজ অঞ্চলে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। ফলে যদি শীর্ষ নেতৃত্ব নিহতও হন অথবা কোনো বড় কমান্ড সেন্টার ধ্বংস হয়ে যায় তবুও যুদ্ধ থেমে থাকবে না। অন্য ইউনিটগুলো নিজেদের মতো করে লড়াই চালিয়ে যাবে। এই যুদ্ধনীতিই আজ ইরানের প্রতিরোধকে অদম্য করে তুলেছে। ২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইরানের এলিট বাহিনী ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কমান্ডার ইন চিফ পদে ছিলেন মহম্মদ আলি জাফারি। কিন্তু তাঁর ভাবনার বীজ রোপিত হয়েছিল আরও আগে ইরান-ইরাক যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে। যুদ্ধের ময়দানে তিনি লিখেছিলেন, আধুনিক যুদ্ধে কেবল অস্ত্রের লড়াই নয় এটি কাঠামো ও কৌশলেরও লড়াই। পরে তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন ২০০৩ সালে আমেরিকার নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণকে। সেই যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের শক্তিশালী সেনাবাহিনী মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙে পড়ে। কারণ ছিল একটাই সামরিক কাঠামো ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতেই পুরো ব্যবস্থাটাই ধসে পড়ে। একইভাবে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন হামলাও দেখিয়েছিল কেন্দ্রভিত্তিক শাসনব্যবস্থা কত সহজে ভেঙে পড়তে পারে।
এই অভিজ্ঞতই জাফারিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছিল। তাঁর ধারণা ছিল ইরান যদি সত্যিই পরাশক্তির সঙ্গে লড়াই করতে চায় তবে তাকে এমন এক প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে যেখানে কোনও ব্যক্তি বা কেন্দ্রের পতনে গোটা রাষ্ট্র ধসে পড়বে না। সেই চিন্তা থেকেই তৈরি হয় মোজাইক ডিফেন্স। একটি মোজাইক ছবি মতোই অসংখ্য ছোট টুকরো মিলেই তৈরি হবে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা। প্রতিটি টুকরো আলাদা কিন্তু প্রয়োজনের সময় একসঙ্গে লড়াই করতে সক্ষম। আজকের পরিস্থিতিতে সেই কৌশলের বাস্তব প্রতিফলনই যেন দেখা যাচ্ছে। শীর্ঘ সামরিক নেতৃত্বের মৃত্যু। বিভিন্ন ঘাঁটিতে হামলা এসবের পরও ইরানের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো পুরোপুরি অক্ষত রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ইউনিটগুলো নিজেদের দায়িত্ব পালন করে চলেছে। এমনকি পাল্টা আঘাতের মাধ্যমে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় আমেরিকার সামরিক উপস্থিতিকেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে তেহরান। এই দৃশ্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের চোখে এক নতুন সামরিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি আয়াতোল্লা খামেনেইকে খতম করেছে আমেরিকা ও ইজরায়েলের বাহিনী। এই হামলায় খামেনেই ছাড়াও আইআরজিসির সর্বাধিনায়ক মেজর জেনারেল মহম্মদ পাকপুর, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সহ বেশ কয়েক জনের মৃত্যু হয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি এফ ওয়ারের প্রতিবেদনে আমেরিকা-ইজরায়েলের যৌথ হামলায় উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মনোবলে ধাক্কা ও তাদের সব ঘাঁটি গুঁড়িয় দেওয়আা। কিন্তু আমেরিকা বা ইজরায়েল কেউই পারেনি তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে। আর তা সম্ভব হয়েছে একমাত্র জাফারির কারণেই। সেটাই দেখছে গোটা বিশ্ব। যৌথ হামলাতেও দমেনি ইরান। পহলভি রাজবংশ পতনেপ পর ইরানের কুর্দিস্তান প্রদেশে থাকে গোয়েন্দা বিভাগে নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন জাফারি। ১৯৭৯-৮৯ সাল পর্যন্ত ইরান-ইরাক যুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। একইসঙ্গে তেহরানের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও একটি ইউনিট সারাল্লাতেও যোগ দিয়েছিলেন জাফারি। ২০০৫ সালে জাফারিকে ইরানের গার্ডস সেন্টার ফ স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের কর্তা করা হয়। পরে তিনি মোজাইক মতবাদ তৈরিতে মনোনিবেশ করেন। ২০০৭ সালে আইআরজিসির সর্বাধিনায়ক করা হয় জাফারিকে। এই কারণেই এখনও তেহরান দমে যায়নি। এখানেই ইরান দেখিয়ে দিয়েছে এত সহজে তারা আত্মসমর্পণ করবে না। তবে এই কৌশল ইরানকে যুদ্ধের নিশ্চিত জয় এনে দেবে কিন না তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, মোজাইক ডিফেন্স হয়তো যুদ্ধ জেতার গ্যারান্টি নয়। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত করে ইরানকে সহজে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না। নেতৃত্ব হারালেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মানসিক ও কাঠামোগত প্রস্তুতি যে রাষ্ট্রের হয়েছে তাকে পরাজিত করা কখনওই সহজ নয়।
আর এখানেই লুকিয়ে আছে পুরো ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি। বিশ্বরাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সামরিক ক্ষমতার জোরে দ্রুত ফলাফল আশা করে। কিন্তু ইরানের ঘটনাটি যেন অন্য এক বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে আধুনিক যুদ্ধে শুধু অস্ত্র বা প্রযুক্তি নয়, কৌশল, কাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত এই কারণেই আজ বহু বিশ্লেষক বলছেন যুদ্ধের ময়দানে সবসময় সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রই জেতে না কখনও কখনও জিতে যায় সবচেয়ে ধৈর্যশীল কৌশল। আর সেই কৌশলের স্থপতি হিসেবে ইতিহাসে হয়তো বিশেষ জায়গা করে নেবেন মহম্মদ আলি জাফারি। কারণ তিনি এমন এক প্রতিরক্ষা দর্শনের জন্ম দিয়েছিলেন যা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় পরাশক্তির গর্জন যতই প্রবল হোক প্রস্তুত ও সংগঠিত প্রতিরোধের সামনে তাকে থমকে দাঁড়াতেই হয়।