নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্নে পুলিশ অবজারভার!

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে দক্ষিণ ২৪ পরগনায়। এবার ডায়মন্ড হারবার ও মগরাহাট পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রকে ঘিরে এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে, যা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিজেপি প্রার্থীদের সঙ্গে পুলিশ অবজারভারের গোপন বৈঠকের অভিযোগে সরব হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ১৪৩ নম্বর ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য নিযুক্ত পুলিশ অবজারভার পারমার স্মিত পরশোত্তমদাস (IPS)-এর আচরণ সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষতার পরিপন্থী। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে তিনি ডায়মন্ড হারবারে অবস্থিত সাগরিকা হোটেলের ২০৮ নম্বর কক্ষে অবস্থান করছিলেন। সেই সময় তিনি মগরাহাট পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী গৌড় সুন্দর ঘোষের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন।
তৃণমূলের দাবি, এই বৈঠকটি কোনও সরকারি নথিভুক্ত বা অনুমোদিত বৈঠক ছিল না এবং নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নির্দেশিকা মেনে তা অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অবজারভার কেন একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর সঙ্গে গোপনে বৈঠক করবেন?
ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে তৃণমূল। জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট পুলিশ অবজারভারের জন্য আলিপুরে আইপিএস মেসে সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি সরকারি আবাসন ব্যবহার না করে একটি বেসরকারি হোটেলে অবস্থান করেন। এই সিদ্ধান্তকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে শাসকদল। তাদের মতে, সরকারি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এই ধরনের পদক্ষেপ সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক এবং সন্দেহজনক।
এরপর আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে আসে। তৃণমূলের দাবি, এই ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই অবজারভার ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী দীপক কুমার হালদারের সঙ্গেও আরেকটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। এই ধারাবাহিক ঘটনায় নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, এই বৈঠকগুলি সম্পূর্ণভাবে গোপনে এবং জনসমক্ষে না এনে সংগঠিত হয়েছে। ফলে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছে। তাদের বক্তব্য, একজন পুলিশ অবজারভারের প্রধান কাজ হল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন সেই ব্যক্তির আচরণই প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থার উপরই আস্থা নষ্ট হয়।
নির্বাচন কমিশনের ‘অবজারভার হ্যান্ডবুক’ (ফেব্রুয়ারি ২০২৪)-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অবজারভারদের আচরণে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা প্রতিফলিত হওয়া আবশ্যক। কোনও অবস্থাতেই এমন কোনও কাজ করা উচিত নয়, যাতে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে বা সেই ধারণা তৈরি হয়। এই প্রসঙ্গ তুলে ধরে তৃণমূল কংগ্রেস জানিয়েছে, পারমার স্মিত পরশোত্তমদাসের আচরণ সেই নির্দেশিকার সম্পূর্ণ বিরোধী।
বুধবার সন্ধ্যায় সাংবাদিক বৈঠক করে মগরাহাট পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী শামীম আহমেদ এই বিষয়ে সরব হন। তিনি অভিযোগ করেন, “২০ এপ্রিল বিজেপি প্রার্থী গৌড় সুন্দর ঘোষের সঙ্গে পুলিশ অবজারভারের বৈঠকের পর থেকেই আমাদের কর্মীদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূলের ব্যানার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে এবং কর্মীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “একজন নিরপেক্ষ অবজারভার কখনও কোনও রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর সঙ্গে গোপন বৈঠক করতে পারেন না। এতে স্পষ্টভাবে পক্ষপাতিত্বের ইঙ্গিত মিলছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে অবিলম্বে এই অবজারভারকে অপসারণের দাবি জানিয়েছি।”
শামীম আহমেদ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব। নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে এই ধরনের বিতর্কিত ব্যক্তিকে সরানো অত্যন্ত জরুরি।”
এই ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিজেপির পক্ষ থেকে যদিও এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে তৃণমূলের অভিযোগে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এই ধরনের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অভিযোগ যদি সত্যি প্রমাণিত হয়, তবে তা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশন ও তার নিযুক্ত আধিকারিকদের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে গোটা ব্যবস্থার উপর আস্থা কমে যেতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, দ্রুত তদন্ত করে দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট অবজারভারকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে। অন্যদিকে, বিজেপির প্রতিক্রিয়া ও কমিশনের পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়।
সব মিলিয়ে, সাগরিকা হোটেলের একটি ‘গোপন বৈঠক’ এখন রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড়সড় ইস্যু হয়ে উঠেছে, যা ভোটের আগে রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।