নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি এক বক্তব্যে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণআন্দোলন ও ক্ষমতার পালাবদলের পর নতুন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই আবারও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে সাম্প্রতিক বক্তব্য। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি এক বক্তব্যে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ১৩ মার্চ ময়মনসিংহ বিভাগে আয়োজিত একটি ইফতার পার্টিতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রপতিকে দ্রুত অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ করে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। শুধু তাই নয়, তিনি আরও বলেন যে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত ও প্রয়োজনে তাকে গ্রেফতারও করতে হবে। তার বক্তব্যে তিনি ইঙ্গিত দেন যে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এবং সেই প্রশ্নের জবাব দিতে সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই একমাত্র পথ।
নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক থাকলেও সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাদের দল সংসদে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু সংসদে উপস্থিত থাকার পরও রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিনকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়টি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তিনি দাবি করেন জুলাই মাসের গণআন্দোলনের সময় যে রাজনৈতিক আকাঙ্খা তৈরি হয়েছিল সেই চেতনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নাহিদ বলেন, তারা স্পিকারের কাছে অনুরোধ করেছিলেন যেন রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের আগে সংসদ সদস্যদের মতামত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সুযোগ না দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলে প্রতিবাদস্বরূপ তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।
রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি আরও বলেন, শপথ গ্রহণের সময় যে সাংবিধানিক দায়িত্ব ও নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা রক্ষা করা হয়নি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এবং দেশের সংকটময় সময়ে তিনি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশেষ করে গণআন্দোলনের সময় সহিংসতা ও দমন-পীড়নের ঘটনাগুলোতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এসব কারণ দেখিয়েই তিনি রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ এবং প্রয়োজন হলে গ্রেফতারের দাবি জানান। ময়মনসিংহের জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনার কথাও স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর জাতীয় ছাত্র শক্তির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল্লাহ জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূ্র্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে তিনি ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করেছিলেন বলে দাবি করা হয়। সেই আন্দোলনের সময় কার বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত শক্তি এখনও নানাভাবে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে ও অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
তার বক্তব্যে অতীত রাজনীতির কথাও উঠে আসে। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ অতীতে গুপ্ত হামলা, অগ্নিসন্ত্রাস ও সংঘাতের রাজনীতির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল। তবে দেশের জনগণ শেষ পর্যন্ত সেই রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলে তিনি দাবি করেন। নাহিদের ভাষায়, ৫ অগাস্টের আন্দোলন ছিল দেশের মানুষের প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। যে আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণ ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা ঘটে। ইফতার পার্টির আগে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী। তিনি বলেন, রাজনীতি যদি সত্যিই জনগণের সেবা করার জন্য হয় তাহলে বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরকে উন্নয়ন ও সৌন্দর্যের দিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমান এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আন্দোলন, ক্ষমতার পরিবর্তন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহন এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। সব কিছু মিলিয়ে দেশ এক রূপান্তরের সময় পার করছে. এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি, সংসদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে। নাহিদ ইসলামের বক্তব্য সেই বিতর্ককে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেয় ও দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ কোন পথে এগিয়ে যায় সেটা এখন সময়ই বলবে।