প্রচার শুরু করলেন নেতাই মণ্ডল

দেওয়ালে লিখনের মাধ্যমে তাঁর নাম ও প্রতীক, সঙ্গে ভোটের আবেদন যা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর তরজা ও জল্পনা।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ভোটের নির্ঘণ্ট এখনও ঘোষণা হয়নি, কিন্তু মালদার রাজনৈতিক আকাশে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে প্রচারের উত্তাপ। দেওয়াল লিখনের রং, স্লোগানের ঝাঁঋ আর পাল্টা অভিযোগে সরগরম গোটা বিধানসভা এলাকা। আচমকাই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন বিজেপির বহিষ্কৃত নেতা নিতাই মণ্ডল। নির্দল প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামার ঘোষণা করে তিনি পুরাতন মালদা পুরসভা এলাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলে দেওয়াল লিখনের মাধ্যমে প্রচার শুরু করেছেন। দেওয়ালে দেওয়ালে লিখনের মাধ্যমে তাঁর নাম ও প্রতীক, সঙ্গে ভোটের আবেদন যা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর তরজা ও জল্পনা।

নিতাই মণ্ডলের দাবি, তিনি বিজেপি ও আরএসএসের আদর্শে অনু্প্রাণিত একনিষ্ঠ কর্মী। দলকে এখনও তিনি অন্তর থেকে ভালোবাসেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে মালদা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক-সহ দলের একাংশ নেতার বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ তাঁরা দলের আগাছার মতো ঢুকে সংগঠনের ক্ষতি করছেন। তাঁদের চক্রান্তেই তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে দাবি করেন নিতাই মণ্ডল। এই বহিষ্কারকে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হিসেবেই দেখছেন। তাই দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে সরাসরি মানুষের দরবারে পৌঁছনোর লক্ষ্যেই নির্দল প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হিসেবেই দেওয়াল লিখনের মাধ্যমে প্রচার শুরু করেছেন তিনি।

তবে মালদা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক গোপাল চন্দ্র সাহার বক্তব্য, যে কেউ ভোটে দাঁড়াতেই পারে। এতে কোন লাভ হবে না। মালদা বিধানসভা বিজেপির মাটি। এখানে বিজেপির জয় হবে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করে বলেন, নিতাই মন্ডলের সঙ্গে তলায় তলায় তৃণমূলের যোগ রয়েছে। যদিও তৃণমূলের সঙ্গে নিতাই মন্ডলের যোগ থাকার কথা সাফ অস্বীকার করেছেন জেলা যুব তৃণমূল সভাপতি প্রসেনজিৎ দাস। তার বক্তব্য, এটা তৃণমূলের আভ্যন্তরীণ কোন্দল। তাই এই বিষয়ে তাদের বলার কিছু’নেই। তবে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে মালদা বিধানসভার বিজেপি বিধায়ককে তারা প্রাক্তন বিধায়ক করে ছাড়বেন।

মালদা কেন্দ্রে একুশের ফল

বিজয়ী প্রার্থী: গোপাল চন্দ্র সাহা
দল: বিজেপি
প্রাপ্ত ভোট: ৯৩,৩৯৮
ভোটের হার: ৪৫.২%
জয়ের ব্যবধান: ১৫,৪৫৬ ভোট

অন্যান্য প্রার্থীদের ফলাফল

উজ্জ্বল কুমার চৌধুরী (তৃণমূল)- ৭৭,৯৪২ ভোট
ভূপেন্দ্রনাথ হালদার (কংগ্রেস)- ২৬,৫৬৩ ভোট

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২১ সালে প্রথম মালদা বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির জয় শুধু একটি নির্বাচনী ফলাফল নয়, বরং জেলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। কংগ্রেস ও তৃণমূলের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই কেন্দ্রে পদ্মশিবিরের উত্থানে মালদার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এই ফলাফল প্রমাণ করেছে যে, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও ভোটব্যাঙ্কের চিরাচরিত ধারণা ভেঙে সাধারণ মানুষের মনোভাব বদলাচ্ছে। উন্নয়ন, সংগঠন ও নেতৃত্বের উপর ভর করেই বিজেপি এই ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে বলে রাজনৈতিক মহলের অভিমত। ফলে মালদা বিধানসভায় বিজেপির এই জয় শুধু অতীতের রেকর্ড ভাঙেনি, ভবিষ্যতের রাজনীতির দিশাও নতুন করে খুলে দিয়েছিল।

বিজেপির বহিষ্কৃত নেতা নিতাই মণ্ডলের নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়াইয়ে নামা মালদা বিধানসভায় পদ্মশিবিরের কাছে বড়সড় অস্বস্তির কারণ বয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় স্তরে তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব ও সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ থাকায় বিজেপির একটি অংশের ভোট তাঁর দিকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে নিতাই নিতাই মণ্ডলের প্রার্থী হওয়া বিজেপির জন্য কতটা বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় তা নির্ভর করবে ভোটের ময়দানে।

সব মিলিয়ে বলা যায় যে, ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার আগেই মালদার রাজনীতি যে এক অদৃশ্য নির্বাচনী ময়দানে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি দেওয়াল লিখন, প্রতিটি বক্তব্য এবং প্রতিটি পাল্টা অভিযোগ ধীরে ধীরে রচনা করছে ভবিষ্যতের লড়াইয়ের চিত্রনাট্য। এই মুহূর্তে কেউ এগিয়ে, কেউ পিছিয়ে তবু শেষ হাসি কে হাসবে তা এখনও অনিশ্চিত। জনতার মন জয় করার এই দীর্ঘ যাত্রাপথে কার কৌশল সঠিক প্রমাণিত হবে, আর কার হিসেব ভেস্তে যাবে তারই অপেক্ষায় দিন গুনছে মালদা। আর সেই প্রতীক্ষার শেষে ভোটের বাক্স খুললেই স্পষ্ট হয়ে যাবে, কে থাকবে ক্ষমতার মসনদে আর কে হার মানবে সময় ও জনরায়ের সামনে।