কৃতিত্বের দড়ি টানাটানি অব্যাহত, আমেরিকার পর চিন!

China’s India-Pak Truce Claim : ভারত-পাক যুদ্ধে মধ্যস্থতা করে শান্তি ফিরিয়েছে বলে দাবি করেছিল আমেরিকা। সেই দাবি আগেই নস্যাৎ করেছে ভারত। এবার একই দাবি করছে চিন। ভারতের কী প্রতিক্রিয়া ?

অনুসূয়া দাস, নিজস্ব সংবাদদাতা: এ কী দশা হল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির ? এ বলে আমার কৃতিত্ব সব থেকে বেশি, তো ও বলে আমার। মানে বলা যেতে পারে। একেবারে দড়ি টানাটানি নিজেদের দিকে ঝোল টানার জন্য। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘর্ষে শান্তি বজায় রাখতে তাঁদের কৃতিত্ব নাকি জুরি মেলা ভার। তাই কৃতিত্ব নিতে একে একে লাইন ধরে এগিয়ে আসছেন। একজন থামে তো আর একজন এগিয়ে আসে। ট্রাম্পকে থামানোর পর এবার চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই চলে এলেন। চলে এলেন নিজেদের জাহির করতে। হয়তো ভাবলেন, যদি সান্তনা পুরস্কার পাওয়া যায়। কিন্তু ব্যাপার কী। কোন ঘটনাকে নিয়ে এতটা জল ঘোলা বা কৃতিত্বের দাবি ?

গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারায় ২৬টি তরতাজা প্রাণ। বেছে বেছে গুলি করে হত্যা করা হয় হিন্দু পুরুষদের। এরপর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু হয় ভারতের। ৬ মে গভীর রাতে ভারত বাহাওয়ালপুর, মুরিদকে সহ পাকিস্তানের ৯টি জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়। সেই অভিযানে প্রায় ১০০ জঙ্গিকে খতম করে ভারত। এরপর থেকেই পাকিস্তানের তরফ থেকে শেলিং শুরু হয় ভারতের ওপর। অপারেশন সিঁদুর পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের শেলিংয়ে ভারতের অন্তত ১৬ জন নাগরিকের মৃত্যু হয়। সংঘাত বাড়তে থাকে দুই দেশের মধ্যে। ১০ মে-র ভোররাতে ভারতীয় বায়ুসেনা হামলা চালিয়ে পাকিস্তানের ১১টি সামরিক ঘাঁটি অকেজো করে দেয়। গোলাবর্ষণে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় একাধিক জঙ্গিঘাঁটি। পাকিস্তানও পাল্টা হামলা চালায়। সেনা সংঘাত তীব্র হয় ক্রমেই। চরমে ওঠে ভারত- পাক সংঘর্ষ। সে সময় টান টান উত্তেজনার পরিস্থিতি তৈরি হয় দুই দেশের মধ্যে। এই সময়কালে পাকিস্তানের এফ-১৬ এবং জেএফ-১৭ শ্রেণির যুদ্ধবিমান সহ পাঁচটি জেট ভারত ধ্বংস করেছিল মাঝ আকাশের লড়াইয়ে। পাকিস্তানের রাডার, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, হ্যাঙ্গার এবং রানওয়ে ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ভারতের হামলায়। পাকিস্তানের একটি সি-১৩০ শ্রেণির বিমানও ধ্বংস করা হয়েছিল এই সংঘাতের সময়। এছাড়া ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূর থেকে একটি AEW&C বা একটি SIGINT বিমান ধ্বংস করেছিল ভারতীয় বায়ুসেনা।

সংঘাতে পাকিস্তানকে সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছিল চিন। যে অস্ত্রে ভারতে হামলা চালিয়েছিল পাকিস্তান, তার বেশিরভাগটাই ছিল চিনের দেওয়া। সেই সময় চিনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দানা বাঁধে। মে মাসে সংঘর্ষ চলাকালীন চিন প্রথমেই ভারতের সামরিক অভিযানকে ‘দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেছিল। পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রতি তাদের সামরিক সমর্থন এবং অস্ত্র সরবরাহ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ভারতীয় সেনার ডেপুটি চিফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাহুল আর সিং অভিযোগ করেন, চিন এই উত্তেজনাকে ‘লাইভ ল্যাব’ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং ভারতের বিরুদ্ধে গিয়ে পাকিস্তানকে সহায়তা দিয়েছে। চিন অবশ্য এই অভিযোগের সরাসরি জবাব এড়িয়ে যায়। কিন্তু, এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েও ভারত-চিন সম্পর্কে উন্নতির বার্তা’ দেয় বেজিং। ওয়াং ই দাবি করেন, ২০২৫ সালে ভারত ও চিন সম্পর্ক ভালো গতিতে এগিয়েছে। তিনি বলেন, চিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তিয়েনজিনে SCO সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং তারপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত হয়েছে।

অন্যদিকে এই যুদ্ধের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ভারত-পাক যুদ্ধ থামাতে তিনি মধ্যস্থতা করেছিলেন। যদিও ভারত সেই দাবি মানেনি। এবার চিনও দাবি করল, ভারত ও পাকিস্তানে সংঘাত বিরতিতে মধ্যস্থতা করেছে তারা। চিনা বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই দাবি করেন, চিন এই বছর যে সকল স্পর্শকাতর ইস্যুতে মধ্যস্থতা করেছে, তার মধ্যে ভারত-পাক সংঘাত অন্যতম। অবশ্য মধ্যস্থতা তো দূরের কথা, অপারেশন সিঁদুরের সময় পাকিস্তানকে সাহায্য করেছিল চিন। শুধুমাত্র চিনা অস্ত্র নয়, রাডার দিয়েও পাকিস্তানকে তারা সাহায্য করেছিল। সেই বেজিং এবার দাবি করল, তারা নাকি শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে। চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই বেজিংয়ে এক আন্তর্জাতিক নীতি সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কখনও এত ঘন ঘন স্থানীয় যুদ্ধ ও সীমান্ত সংঘর্ষ দেখা যায়নি। এই অস্থিরতার সময় চিন নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি স্থাপনে কাজ করেছে। তাঁর দাবি, সেই ধারাতেই চিন উত্তর মায়ানমার, ইরানের পরমাণু ইস্যু, প্যালেস্তাইন-ইজরায়েল, কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ডের পাশাপাশি ভারত-পাকিস্তানের সংঘর্ষ থামাতেও মধ্যস্থতা করেছে।

এদিকে ভারতের স্পষ্ট বক্তব্য, ১০ মে ভারতের মার খেয়ে নাজেহাল দশা হয় পাকিস্তানের। এরপর ভারতের ডিজিএমও-র কাছে সংঘর্ষবিরতির আবেদন জানিয়েছিল পাকিস্তান। তাতে সাড়া দিয়ে ভারত সংঘর্ষবিরতিতে সম্মত হয়। মানে বলা যেতে পারে ভারত-পাক সংঘর্ষবিরতিতে চিনের কৃতিত্ব নেওয়ার আশায় জল ঢালল ভারত। চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-র দাবি বুধবার স্পষ্ট ভাষায় খারিজ করে ভারত জানায়, সংঘর্ষবিরতিতে তৃতীয় পক্ষের কোনও ভূমিকা নেই। দুই দেশের ডিজিএমও- এর মধ্যে সরাসরি আলোচনার পরই ১০ মে সংঘাত স্থগিত করা হয়। যদিও ভারতের পক্ষে আগেই জানানো হয়েছে, অপারেশন সিঁদুর এখনও বহাল রয়েছে।