নিউ ইয়র্কের রাজনীতিতে প্রগতির মুখ!

‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট’, একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তান, এক মুসলিম- এবং এখন আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহরের মেয়র  জোহরান মামদানি।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক: নিউ ইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তায় আজ এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। শেয়ারবাজারের ছন্দ, মুক্তবাজারের গৌরব- সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ, যাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে এখন সরগরম গোটা আমেরিকা। একজন ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট’, একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তান, এক মুসলিম- এবং এখন আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহরের মেয়র। তাঁর নাম- জোহরান মামদানি। কিন্তু প্রশ্ন একটাই-

নিউ ইয়র্ক কি সত্যিই সমাজতন্ত্রের পথে হাঁটছে?

না কি এটি শুধুমাত্র আরেকটি রাজনৈতিক কৌশল

সময়ের দাবি মেনে গড়া এক নতুন ইমেজ?

কয়েক সপ্তাহ আগেও, নির্বাচনের আগে এক শুক্রবারে, ব্রঙ্কসের এক মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন জোহরান মামদানি। তাঁর মুখে আবেগ, গলায় দৃঢ়তা নিয়ে বলেন-

আমি আমার ধর্ম লুকাব না

আমি গর্বিত আমি একজন মুসলিম

এই বক্তৃতার আগেই, এক রেডিও হোস্ট তাঁকে নিয়ে মন্তব্য করেন- যদি ৯/১১ আবার হয়, মামদানি হয়তো খুশি হবেন। এই মন্তব্যে ক্ষোভে ফেটে পড়েন তিনি। একজন মুসলিম প্রার্থী হিসেবে, এটাই ছিল তাঁর জীবনের বাস্তবতা- সন্দেহ, আক্রমণ, ভয় কিন্তু তবুও লড়াই জারি। তবে এই লড়াই শুধু ধর্ম নিয়ে ছিল না। এটি ছিল আমেরিকার রাজনীতির পুরোনো কাঠামোর বিরুদ্ধে এক নতুন ভাবনার উত্থান। সমাজতন্ত্রের, সমতার, এবং নতুন প্রজন্মের রাজনীতির।

২০২৫ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে তিনি প্রাক্তন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো ও রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়াকে হারান। জয় পান ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট অব আমেরিকা বা DSA–র সমর্থনে। একদা পুঁজিবাদের রাজধানী নিউ ইয়র্কের এখন মেয়র এক সমাজতন্ত্রী- এই খবরেই চমকে ওঠে ওয়াশিংটন থেকে ওয়াল স্ট্রিট। তবে বিতর্ক এখানেই শেষ হয়নি। ‘Just The News’ নামের এক মার্কিন নিউজ পোর্টাল ফাঁস করে DSA-র অভ্যন্তরীণ নথি- যেখানে লেখা ছিল, “অ্যান্টি–ইজরায়েল” নীতিমালা কার্যকর করতে কীভাবে সংগঠনটি নতুন মেয়র মামদানির ওপর চাপ তৈরি করতে চায়। তাদের দাবি,

নিউ ইয়র্ক সিটির পেনশন ফান্ড থেকে ইজরায়েলি বন্ডে বিনিয়োগ বন্ধ করা হোক

ইজরায়েলের সঙ্গে ব্যবসা করা কোম্পানির সঙ্গে সব সরকারি চুক্তি বাতিল করা হোক

এমনকি ইজরায়েলি পণ্যবাহী পণ্য দোকান থেকেও তুলে দেওয়া হোক

এমন এক তালিকায় লেখা ছিল আরও এক চমকপ্রদ দাবি- ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেফতার করা।  এইসব তথ্য ফাঁস হওয়ার পর প্রশ্ন উঠতে শুরু করে-

মামদানি কি সত্যিই এক “কমিউনিস্ট মেয়র”?

তিনি কি শুধু সমাজতন্ত্রের মুখোশ পরে বসেছেন?

ট্রাম্প স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান:মামদানি একজন ১০০% কমিউনিস্ট লুনাটিক। অন্যদিকে মামদানি জানান- আমি কমিউনিস্ট নই। আমি সেই নিউ ইয়র্কের পক্ষে দাঁড়িয়েছি, যেখানে প্রত্যেকে নিজের স্বপ্ন দেখতে পারে। কিন্তু পুরোনো সমাজ মাধ্যমের বক্তৃতা আর ভিডিও ক্লিপ অন্য ছবি দেখায়। যেখানে মামদানি বলেছেন,

আমাদের শেষ লক্ষ্য-

উৎপাদনের উপকরণ জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া

যা সরাসরি মার্কসবাদী দর্শনের ভাষা

আরও এক বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, DSA-র লড়াই মানে কেবল স্থানীয় রাজনীতি নয়, এটি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এই প্রসঙ্গে উঠে আসে লন্ডনের মেয়র সাদিক খান-এর নাম। সাদিক খানের মতে, আমি মুসলিম রাজনীতিবিদ নই, আমি এমন একজন রাজনীতিবিদ, যে মুসলিম। তাঁরও মতে মামদানি মুসলিম পরিচয়ের কারণে হামলার মুখে পড়েছেন। তবু দুজনেই এক সুরে বলেন- আমাদের জয়, বিশ্বাসের কারণে নয়, কাজের কারণে। সাদিক খানের মন্তব্য, “নিউ ইয়র্ক আর লন্ডন- এই দুই শহর প্রমাণ করে, বৈচিত্র্যের ওপর ভরসা রাখলে মানুষ বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু আদর্শ আর বাস্তবতার ফারাক যতটা গভীর, ততটাই বিপজ্জনক। DSA–র অভ্যন্তরে তৈরি হচ্ছে চাপ- কীভাবে মামদানিকে “তাদের নীতিতে” আনা যায়, কীভাবে তাঁর প্রশাসনে সমাজতন্ত্রীদের জায়গা নিশ্চিত করা যায়। তাদের মিটিং নথিতে লেখা-

যদি মেয়র আমাদের সমর্থন চায়

তাহলে আমাদের অগ্রাধিকারকে মানতে হবে

এই ঘোষণাই দেখায়- একদিকে রাজনীতি, অন্যদিকে মতাদর্শ। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে জোহরান মামদানি, যিনি এখন নিউ ইয়র্কের প্রতিটি নাগরিকের প্রত্যাশার মুখোমুখি। এখন নিউ ইয়র্কের নাগরিকরা অপেক্ষায়- তাদের মেয়র কি আদর্শের পথে হাঁটবেন, না কি বাস্তবতার ভারে নীতির দিক পরিবর্তন করবেন? একদিকে সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন, অন্যদিকে পুঁজিবাদের গতি। একদিকে বহুত্ববাদ আর ধর্মীয় সহনশীলতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিভাজনের ভয়। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে গড়ে উঠছে নতুন নিউ ইয়র্ক। এক মুসলিম, এক সমাজতন্ত্রী, এক তরুণ নেতা- জোহরান মামদানি এখন প্রতীক হয়ে উঠেছেন এক নতুন ধরণের রাজনীতির। যে রাজনীতি শুধু নির্বাচনের জয়ের গল্প নয়, বরং লড়াই নিজের পরিচয়, বিশ্বাস, এবং নীতির মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার। সময় বলবে- এই লড়াই কি নিউ ইয়র্ককে বদলাবে? না কি নিউ ইয়র্কই বদলে দেবে জোহরান মামদানিকে। এরকম বিভিন্ন খবর পেতে চোখ রাখুন আর প্লাস নিউজের ইউটিউব এবং ফেসবুক পেজে।