আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। কোভিড-১৯-এর মতো এটি দ্রুত ছড়ায় না, কিন্তু আক্রান্ত হলে রোগীর অবস্থা খুব দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। এই কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিপাকে ‘প্রায়োরিটি প্যাথোজেন’ বা সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ভাইরাসের তালিকায় রেখেছে।

সূচনা পল্য়ে, সাংবাদিক : নিপা ভাইরাস আজ ভারতের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি শুধুমাত্র একটি ভাইরাল সংক্রমণ নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য মহামারীর একটি স্পষ্ট সতর্ক সংকেত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেরলে একাধিকবার নিপা সংক্রমণের ঘটনা ধরা পড়েছে। ২০১৮ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের পরে ২০২১, ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালেও নতুন করে আক্রান্তের খবর সামনে এসেছে। প্রতিবারই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিলেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। ২০১৮ সাল থেকে কেরলে নিপা ভাইরাসে ২২ জন প্রাণ হারান। ২০২৫ সালের জুন মাসে ১৪ বছর বয়সি এক কিশোর নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই মারা যায়। ওই বছরেই মলপ্পুরমে ২৪ বছর বয়সি এক যুবক নিপার শিকার হন। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায় যে গত সেপ্টেম্বরে কোজিকোড়ে স্কুল, কলেজ, সরকারি দফতর ও গণ-পরিবহণ কিছুদিনের জন্য বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় জেলা প্রশাসন। পরিসংখ্যান বলছে ২০১৮ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ছবার নিপা ভাইরাস থাবা বসায় দক্ষিণের এই রাজ্যে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে দু-বার এর দাপট দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গে ১৯ বছর পরে ফের এই ভাইরাসের অস্তিত্ব মিলল। ২০০৭ সালের এপ্রিলে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নদিয়ার বেলেচুয়েপাড়ায় নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পাঁচজন মারা যান। এবার প্রায় দুই দশক পরে ফের রাজ্যের নিপা ভাইরাস আক্রান্তদের সন্ধান মিলল। বারাসতে আক্রান্ত হয়েছেন দুজন নার্স। তাঁদের দুজনেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে সূত্রের খবর।
নিপা ভাইরাসে মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। কোভিড-১৯-এর মতো এটি দ্রুত ছড়ায় না, কিন্তু আক্রান্ত হলে রোগীর অবস্থা খুব দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। এই কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিপাকে ‘প্রায়োরিটি প্যাথোজেন’ বা সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ভাইরাসের তালিকায় রেখেছে। এই ভাইরাসের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল এখনও পর্যন্ত কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা অনুমোদিত টিকা সাধারণ মানুষের জন্য উপলব্ধ নয়। চিকিৎসা মূলত উপসর্গের উপর নির্ভর করে। আইসোলেশন, অক্সিজেন সাপোর্ট, আইসিইউ ব্যবস্থাপনা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণই একমাত্র ভরসা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন ও মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি নিয়ে গবেষণা চললেও সেগুলি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। নিপা সংক্রমণের লক্ষণ সাধারণ ফ্লু-এর মতন জ্বর, মাথাব্যথা, গা ব্যথা দিয়ে শুরু হলেও খুব দ্রুত নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহ দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগী কয়েক দিনের মধ্যেই কোমায় চলে যান। যারা বেঁচে যান, তাঁদের অনেকেরই দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিভ্রংশ, স্নায়বিক দুর্বলতা এবং মানসিক পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা যায়।
নিপা ভাইরাসের উৎস মূলত ফলভোজী বাদুড়। নগরায়ণ এবং মানুষের বসতি বিস্তারের ফলে বাদুড়ের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। ফলে তারা মানুষের খাবার ও বসতির কাছাকাছি চলে আসছে। দূষিত ফল কিংবা খেজুরের কাঁচা রস থেকে ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়াও সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটতে পারে। এই সংক্রমণের প্রভাব শুধু স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নিপা ধরা পড়লেই আক্রান্ত এলাকায় স্কুল-কলেজ বন্ধ, বাজারে মানুষের ভিড় কমে যাওয়া, পর্যটন কার্যত স্তব্ধ হয়ে যাওয়া এবং কৃষিজ পণ্যের বিক্রি কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড়সড় ধাক্কা লাগে। অনেক সময় আক্রান্ত এলাকার মানুষ সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে পড়েন, যা মানসিক চাপও বাড়ায়। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপরেও নিপা বড় চাপ সৃষ্টি করে। হাই-রিস্ক সংক্রমণ হওয়ায় বিশেষ প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স, পিপিই কিট, আইসোলেশন ওয়ার্ড এবং ল্যাব সুবিধা প্রয়োজন হয়। ফলে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা পরিষেবা অনেক ক্ষেত্রে ব্যাহত হয়। গ্রামীণ ও সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিকাঠামোর ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এমন ভাইরাসজনিত সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের বাড়তি সংস্পর্শ এবং আন্তর্জাতিক যাতায়াত সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- যেখানে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। সরকারের তরফে তাই নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। দ্রুত পরীক্ষা, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং, কোয়ারেন্টাইন ও সচেতনতা প্রচার বাড়ানো হচ্ছে। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য সংস্থাগুলি যৌথভাবে কাজ করছে যাতে সংক্রমণ ছড়ানোর আগেই তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবুও দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব গবেষণা পরিকাঠামো শক্তিশালী করা, ভ্যাকসিন উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের দিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন হল, সাধারণ মানুষ কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন। কী কী সতর্কতা তাঁদের অবলম্বন করা উচিত। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভালোভাবে ধোয়া ছাড়া ফল খাওয়া উচিত নয়। ফলের মধ্যে যদি কোনও প্রাণীর কামড়ানোর দাগ থাকে তা হলে সেই ফল খাওয়া চলবে না। কাঁচা খেজুরের রস এড়িয়ে চলতে হবে। বাদুড় বা অসুস্থ পশুর সংস্পর্শে যাওয়া বিপজ্জনক। জ্বর, মাথাব্যথা বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। তবে তাঁরা এও বলছেন, আতঙ্ক নয়, সচেতনতা। সঠিক তথ্য, দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণই পারে নিপাহের মতো মারাত্মক সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে।