চাকরি পেলেন না কাশ্মীর হামলায় মৃতের পরিবারের কেউ

নির্বাচনের আগে ফের প্রকাশ্যে কেন্দ্রের ব্যর্থতা। কেন্দ্রের তরফে কেউ খোঁজটুকুও করেনি।

সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নিজস্ব সংবাদদাতা :  ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল, গোটা ভারতের বুকে তৈরি হয়েছিল এক দগদগে ঘা। কাশ্মীরের মাটি রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল পাক সন্ত্রাসী হানায়, বেছে বেছে ধর্ম জেনে হিন্দু নিধন করা হয়েছিল এই ভারতের বুকে, সেদিনের কথা ভাবলে এখনও শিউরে উঠি আমরা সকলেই, জঙ্গিরা সকলেই কি ধরা পড়ল? উত্তর এখনও অধরা, ঠিক কিভাবে কোন গাফিলতির জেরে এত বড় ঘটনা ঘটল? উত্তর এখনও অধরা, সেই পুলওয়ামা থেকে পহেলগাও নিজের ট্র্যাডিশোন বজায় রেখেছে কেন্দ্র সরকার। একটা করে জঙ্গি হামলা হবে আর ঠিক তারপরেই এয়ার স্ট্রাইক হবে কিন্তু সমস্যার মূল জায়গায় পৌছনো যাবে না কিছুতেই। কেন কাশ্মীরের পর্যটন স্থলগুলিতে যথাযথ নিরাপত্তা থাকবে না বলতে পারেন? এত বড় ঘটনার দায় এড়াতে কি পারে কেন্দ্র?

হ্যাঁ পারে তো, পারছে তো আর তাই প্রায় এক বছর হতে চললেও এখনও চাকরি পেলেন কাশ্মীর হামলায় নিহত সমীর গুহর স্ত্রী। কেন্দ্রের উদাসীনতায় কেন্দ্রের ইচ্ছেকৃত গাফিলতির জেরে একটা গোটা পরিবার তো সব হারিয়েছে বটেই কিন্তু তারপরেও যে সুরক্ষা টুকু দিয়ে তাঁদের পাশে থাকা যেত সেই কর্তব্যটুকুও করেনি কেন্দ্র। অথচ কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এই রাজ্য দখলের স্বপ্ন দেখে কিন্তু রাজ্যের মানূষের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে এতটুকুও ভাবিত নয়। ভয়াবহ সেই ঘটনার পর চোখের নিমেষে পার হয়ে গিয়েছে ১০ মাস কিন্তু চাকরির জন্য এখনও হন্যে হয়ে ঘুরতে হচ্ছে নিহত সমীর গুহের স্ত্রী শবরী গুহকে। বেহালার এই পরিবার এখনও চূড়ান্ত দিশাহারা। তাঁদের অবস্থার তেমন কোনও উন্নতি হয়নি গত ১০ মাসে। শবরী বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে ঘটনার পর থেকে তাঁদের কোনও খোঁজই নেওয়া হয়নি! ঠিক কতটা লজ্জার কথা এটা, যেটুকু সঞ্চয় ছিল সেটুকু দিয়ে কোন মতে দিন কাটাচ্ছেন সমীর গুহর স্ত্রী সন্তান, সেই সঞ্চয়ও তো ফুরিয়ে আসছে এরপর কি করবেন কিভাবে দিন কাটাবেন সেই চিন্তা রোজ কুরে কুরে খায় শবরীকে।

সমীর কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি করতেন। গত এপ্রিলে পরিবার নিয়ে কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়েছিলেন। স্ত্রী এবং নাবালিকা কন্যার চোখের সামনে পাক মদত পুষ্ট জঙ্গিরা তাঁকে গুলি করে খুন করে। তাঁর মৃত্যুর পরে অথৈ জলে পড়েছিল গুহ পরিবার। বছর ছয়েক আগে কেনা ফ্ল্যাটের ঋণ পরিশোধ করতে করতেই নাভিশ্বাস উঠছিল শবরীর। সঙ্গে কন্যার পড়াশোনার খরচ। স্বামীর অফিস থেকে এখন পেনশনের টাকা পাচ্ছেন বটে। কিন্তু চাকরির নিশ্চিত আয় না-থাকায় সমস্যা হচ্ছে। দিন দিন কমে আসছে সঞ্চয়।কিন্তু সেই চাকরি যেন বিশ বাও জলে, কবে হবে এটা এমন এক প্রশ্ন যার কোন উত্তর নেই, কেন্দ্রের তরফে কোন রকম কোন উদ্যোগই তো নেওয়া হয়নি। সামান্য খোঁজটুকুও নেয়নি এই বিজেপি সরকার। স্বামীর কলকাতার অফিসেই চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন শবরী। এখনও অফিস থেকে কোনও জবাব আসেনি। একাধিক বার খোঁজ নিয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের অফিস জানিয়েছে, তাঁর আবেদন দিল্লিতে পাঠানো হয়েছে।

এর বেশি আর কোনও তথ্য নেই! ব্যস তাঁদের দায় শেষ, আর কোনও কিছু তাঁদের করার নেই। পহেলগাঁও হামলায় পশ্চিমবঙ্গের তিন জন নিহত হয়েছিলেন। রাজ্য সরকার প্রত্যেক পরিবারের জন্য ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করেছিল। সেই টাকা আগেই পেয়েছেন শবরী। কিন্তু চাকরির বিষয়টি অনিশ্চিত।মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করার সময়ে বলেছিলেন, কেউ চাকরি চাইলে তাঁকে চাকরি দেওয়া হবে। শবরী অবশ্য রাজ্য সরকারের কাছে চাকরির জন্য কোনও আবেদন করেননি। আবেদন করেছেন নিহত স্বামীর অফিসে। কিন্তু ধন্দে রয়েছেন। বলছেন, ১০ মাস হয়ে গেল! আদৌ কি চাকরিটা পাব? দেওয়ার হলে কি এত দিনে দিত না? নাকি এই ধরনের চাকরির ক্ষেত্রে আবেদনের জবাব আসতে এতটাই সময় লাগে? গত ১০ মাসে স্থানীয় স্তরে রাজ্যের তরফে সব রকমের সাহায্য পেয়েছেন। তাঁদের এলাকার কাউন্সিলর প্রায়ই খোঁজখবর নিয়ে যান। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে এখনও তাঁদের বাড়িতে কেউ আসেননি, কেউ ফোনেও যোগাযোগ করেননি। তবে এই চূড়ান্ত আর্থিক টানাটানির কোনও প্রভাব অবশ্য এক্মাত্র কন্যার কেরিয়ারে পড়তে দিতে চান না শবরী। প্রাণপণে সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিমাসে ধার পরিশোঢ। তাঁদের কন্যা শুভাঙ্গী গত অক্টোবরে ১৮ বছরে পা রেখেছেন।

কলকাতার এক বেসরকারি কলেজে সাইকোলজি নিয়ে স্নাতক স্তরে ভর্তি হয়েছেন। তার খরচে কার্পণ্য করছেন না মা। শবরীর কথায়, ‘‘মেয়ের ভবিষ্যৎটা নষ্ট করতে পারব না। তাই ওর পড়াশোনায় খামতি রাখতে চাই না। কিন্তু এভাবে কতদিন লড়াইটা লড়তে পারবেন সেটাই তো বড় প্রশ্ন। কেটে গিয়েছে দশ মাস তবু এই একাকী জীবনের সঙ্গে এখনও ধাতস্থ হতে পারেননি শবরী। নিজের হোয়াটস্‌অ্যাপে এখনও স্বামীর সঙ্গে ছবি। কথা বলতে বলতে যখন তখন চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। অবচেতনেও হয়তো খোঁজেন সেই সঙ্গীকে, যাঁকে স্বামী কম, বন্ধু হিসাবে বেশি দেখতেন। যে কোনও কঠিন সময়ে পরস্পরকে আঁকড়ে থাকতেন। শবরীর বারবার জানিয়েছেন যে তার স্বামী তার বন্ধু ছিল। সব কথা ওকে বলতাম। এখন আমার জীবনে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছে, এত যে কষ্ট হচ্ছে আমার, সেটা ভাগ করে নেওয়ার জন্যেও ওকে পাচ্ছি না!’’ এই ঘোর অন্ধকার কি আদৌ কাটবে শবরীর জীবনে,তার অজানাই।