যুদ্ধের আগুনে ঘি ! তেহরানকে ক্ষেপণাস্ত্র দেবে উত্তর কোরিয়া ?

রিয়া দাস, সাংবাদিক : রাতের নীরবতা ভেঙে কখনও কখনও এমন কিছু কথা উঠে আসে যা বাস্তবের চেয়ে অনেক তীক্ষ্ণ। এমনই এক কথা সাড়া জাগিয়ে শিরোনামে উঠে এসেছে। সে কথা যেন নতুন কোনও সংঘাতের পূর্বাভাস বলাই যায়। যে কথাটা হল কিম জং উনের হুঁশিয়ারি। কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই। এই হুঁশিয়ারি কি সত্যিই আসন্ন বিপদের সংকেত, নাকি বৈশ্বিক রাজনীতির চেনা কূটনৈতিক ভাষাকেই আরও চড়া করে তুলে ধরা হচ্ছে ? পশ্চিম এশিয়া উত্তেজনার আবহে ইরানের পাশে কোনও দেশকেই দেখা যায়নি। না রাশিয়া, না চিন ইরানের বিরুদ্ধে কোনও মন্তব্য করেছে। সবাই বলেছে আলোচনার মাধ্যমে যু্দ্ধ থামাতে। তবে এবার কিম জং উনকে দেখা যায় ইরানের হয়ে মন্তব্য করতে। তাঁর একটি কথিত সতর্কবার্তা বা কড়া মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আসলেই কি তিনি সরাসরি কোনও সামরিক হুমকি দিয়েছেন? নাকি দীর্ঘ দিনের অবস্থানকে নতুন প্রেক্ষাপটে বসিয়ে আরও ভয়ংকর করে দেখা হচ্ছে?
যে ঘটনাটি থেকে কিম জং উন আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। পশ্চিম এশিয়া সামরিক উত্তেজনার আগুন দিন দিন বেড়েই চলেছে। সেই আবহে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন। ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধের টান টান মুহূর্তেই সরাসরি ইরানের পক্ষ নিয়ে তিনি ছুঁড়লেন কঠোর হুঁশিয়ারি। প্রয়োজনে তেহরানকে ক্ষেপণাস্ত্র দেবে উত্তর কোরিয়া। তবে একটি মাত্র মিসাইল নাকি পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ইজরায়েলকে মুছে ফেলতে যথেষ্ট। শনিবার ইরানে ইজরায়েলের হামলার পর তিন দিন চুপ ছিলেন কিম। এই নীরবতা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় নানা জল্পনা। এমনকি রসিকতাও করে অনেকে প্রশ্ন তোলেন তবে কি এবার মাঠের বাইরে কিম। মঙ্গলবার সেই নীরবতা ভাঙলেন কিম জং উন। বোমা ফাটালেন তিনি। কিম স্পষ্ট ভাষায় জানালেন, ইরান চাইলে উত্তর কোরিয়া ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র সহায়তা করবে। আর এই ক্ষেপণাস্ত্র নাকি পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ইজরায়েলকে মুছে ফেলতে যথেষ্ট। এই মন্তব্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক মহলে। একদিকে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস অন্যদিকে সমালোচকদের তীব্র প্রতিক্রিয়া। ফলে সামাজিক মাধ্যমে কিম জং উনের এই মন্তব্য ঝড় তুলেছে নেটিজেনরাও। কেউ বলছেন, এটা কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল। আবার কেউ বলছেন মজা করে লিখছেন কিম আবার খেলায় ফিরছেন। তবে ইজরায়েল, মার্কিন ও ইরান সংঘাতের বাস্তব চিত্র খুবই ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্র এরমধ্যেই পশ্চিম এশিয়ার অন্তত ১৪ টি দেশ থেকে নিজের দেশের নাগরিকদের দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সৌদি আরব ও কাতার সহ একাধিক দেশে জারি করা হয়েছে ভ্রমণ সতর্কতা। এদিকে মানবাধিকার সংস্থা গুলির তথ্য অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া হামলার পর ইরানে এখনও পর্যন্ত এক হাজারের বেশি নাগরিক নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে।
যুদ্ধের আবহে কিমের এই দাবি, ইরান চাইলে উত্তর কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্র দেবে। শুধু তাই নয়, সেই ক্ষেপণাস্ত্র নাকি পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ইজরায়েলকে মুছে ফেলতে সক্ষম। এই কথাটি আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ও উত্তেজনা বাড়িয়েছে। কিন্তু এই বক্তব্যের বাস্তব ও কূটনৈতিক ওজন কতটা? আর পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে এর প্রভাবই বা কী হতে পারে। তবে প্রথমেই বুঝতে হবে, উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে জাতীয় শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে এসেছে। ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে তারা একাধিকবার নিজেদের সামরিক সক্ষমতার বার্তা দিয়েছে বিশ্বকে। অন্যদিকে ইরানও নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে যথেষ্ট অগ্রসর ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে তা গুরু্ত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এই দুই দেশের সম্ভাব্য সামরিক সহযোগিতা নিয়ে অতীতেও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা হয়েছে। তবে সরাসরি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র হস্তান্তরের প্রশ্ন এলে তা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। ইজরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা। এই ধরনের বক্তব্য অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও প্রতীকী ভাষা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় এমন শব্দ ব্যবহার করা হয় শক্ত অবস্থান প্রদর্শনের জন্য। কিন্তু বাস্তবে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়ার দিক থেকেও প্রায় অকল্পনীয়। ইজরায়েল নিজেই উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অধিকার। যেমন আয়রন ডোম ও অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ প্রযুক্তি নিয়ে সুসজ্জিত। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তির কৌশলগত সমর্থনও তাদের রয়েছে। ফলে সরাসরি এমন কোনও আক্রমণ বা অস্ত্র হস্তান্তর হলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ইরান-ইজরায়েল উত্তেজনা, গাজা ইস্যু, লেবানন ও সিরিয়ায় সংঘাত। সব মিলিয়ে অঞ্চলটি এক অস্থির সমীকরণের মধ্যে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে উত্তর কোরিয়ার প্রকাশ্যে সমর্থন বা সামরিক সহায়তার ইঙ্গিত ইজরায়েলের জন্য কৌশলগত উদ্বেগ বাড়াতে পারে। কারণ এতে বহুমুখী সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়, যেখানে একাধিক রাষ্ট্র পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে। তবে একইসঙ্গে এটাও সত্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বক্তব্য ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে অনেক ফারাক থাকে। অনেক সময়, এমন মন্তব্যের উদ্দেশ্য সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। কিম জং উনের এই মন্তব্য ইজরায়েলের উপর সরাসরি সামরিক প্রভাব ফেলবে কি না, তা নির্ভর করবে বাস্তব পদক্ষেপের উপর। যদি এটি কেবল কূটনৈতিক ভাষণ হয় তাহলে তা মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও আন্তর্জাতিক আলোচনার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু বাস্তব সহযোগিতার প্রমাণ মিললে তা ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। আঞ্চলিক জোটগুলোকে আরও সক্রিয় করতে পারে ও যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমা শক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারে। বিশ্ব রাজনীতির দাবার ছকে প্রতিটি বক্তব্য একটি চাল। কখনও তা প্রতিরক্ষামূলক, কখনও আক্রমণাত্মক, কখনও কৌশল। মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার মতো শব্দ যতই তীব্র শোনাক বাস্তবের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এত সহজে ভেঙে পড়ে না। এখন দেখার বিষয় যে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে সংঘাতের মধ্যে কিমের এই মন্তব্য কতটা প্রভাব ফেলবে।