সুন্দরবন লাগোয়া কুলতলীর প্রত্যন্ত গ্রাম ট্যেংরাবিচিতে শারদোৎসবের মণ্ডপসজ্জায় এবার উঠে এসেছে সামুদ্রিক জীব অক্টোপাস। ট্যেংরাবিচি তিন পল্লী সাথী সংঘ ক্লাবের চতুর্থ বর্ষের পুজোয় এই অভিনব থিম ইতিমধ্যেই দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে। আয়তনে মণ্ডপ খুব বড় না হলেও পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে উদ্যোক্তাদের ভাবনার পরিধি যে অনেকটাই বড়, তা স্পষ্ট তাঁদের এবারের থিমে।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা
সুন্দরবনের নদী, খাল ও জলাভূমিকে ঘিরে জীবনযাপন করেন এই এলাকার বহু মানুষ। অথচ দিনের পর দিন বিভিন্ন কলকারখানার দূষিত বর্জ্য নদী ও জলাশয়ে মিশে জলজ পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ক্রমশ নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। সেই আশঙ্কার কথাই অক্টোপাসের আদলে মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন উদ্যোক্তারা।
শুধু এবছর নয়, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভিন্নধর্মী ভাবনাকে সামনে রেখে পুজোর আয়োজন করে আসছে টেংরাবিচি তিন পল্লী সাথী সংঘ। এক বছর তাঁদের ভাবনায় ছিল বিশাল বৃক্ষ সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং বৃক্ষরোপণের বার্তা। পরবর্তী সময়ে মণ্ডপে উঠে এসেছে অ্যানাকোন্ডা, তারপর কিংকং। আর এবার সামুদ্রিক জীব অক্টোপাসকে কেন্দ্র করে পরিবেশ দূষণ ও জলজ বাস্তুতন্ত্র রক্ষার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা।
উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, আধুনিকতার ছোঁয়ায় ক্রমশ বদলে যাচ্ছে সুন্দরবন লাগোয়া প্রত্যন্ত এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা না করলে আগামী দিনে তার বড় মূল্য দিতে হবে। তাই উৎসবের আনন্দের মধ্য দিয়েই সাধারণ মানুষের কাছে পরিবেশ রক্ষার বার্তা পৌঁছে দেওয়াই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য।
টেংরাবিচির মতো অনুন্নত ও প্রত্যন্ত এলাকায় শারদোৎসব শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, মানুষের মিলন ও আনন্দের অন্যতম উপলক্ষ। সারা বছর দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে চলা মানুষের কাছে পুজোর এই কয়েকটি দিন হয়ে ওঠে একটু অন্যরকম। বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের আনাগোনা বাড়ে। উৎসবের আনন্দে সাময়িক হলেও ভুলে থাকা যায় নিত্যদিনের অভাব-অনটন।
সেই আনন্দকে আরও বিস্তৃত করতেই ক্লাবের পক্ষ থেকে পুজোর পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডও চালিয়ে যাওয়া হয়। রক্তদান শিবির, বস্ত্রদান, অন্নভোজনসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ায় সংগঠনটি। পুজোর দিনগুলিতে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি এবং সরকারি নির্দেশিকা মেনে চলার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দর্শনার্থীরা কীভাবে মণ্ডপে আসবেন, কোন পথে যাতায়াত করবেন—সেই বিষয়েও উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকায় হলেও এবারের অক্টোপাস থিমকে ঘিরে আশপাশের গ্রামগুলির পাশাপাশি দূর-দূরান্তের মানুষের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
এই পুজোর মূল ভাবনা ও পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছেন সুশোভন মণ্ডল, সমীর সরদার, দেবাশীষ মণ্ডল ও শান্তনু গায়েন-সহ ক্লাবের সদস্যরা। তাঁদের কথায়, “কুলতলীর পিছিয়ে পড়া গ্রামের মানুষদের জন্য পুজোর এই কয়েকটা দিন আনন্দের। তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আর সেই আনন্দের সঙ্গে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার বার্তাটিও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।”
উৎসবের আলোয় যখন শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র সেজে উঠছে, তখন সুন্দরবনের প্রান্তিক জনপদ টেংরাবিচির এই ছোট্ট পুজো যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে—মণ্ডপের আকার বড় হওয়াই শেষ কথা নয়, মানুষের ভাবনাই একটি উৎসবকে বড় করে তুলতে পারে।