স্বস্তিতে অফিসের কর্মীরা

অনুসূয়া হালদার, নিজস্ব সংবাদদাতাঃ অফিসের কাজের সময় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আপনার কাছে মেইল এসেছে। এবার ভাবছেন.. অফিসের এই মেইলের উত্তর এক্ষুনি পাঠাবেন নাকি পরে। এবার এইসব ভাবতে ভাবতে আরেকটা চিন্তা মাথার মধ্যে ঘন্টা বাজাবে। আচ্ছা ? মেইলের যে উত্তর দিলেন না, তার জন্য ম্যানেজার আবার ছুটির দিনে ফোন করে দেবে না তো ? বেসরকারি বেশিরভাগ অফিসে এ পরিস্থিতি যেন প্রতিদিনের হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজের সময় শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু কাজ পিছু ছাড়ে না। অসন্তোষ প্রকাশ করলেও কিছু করার থাকে না। বাধ্য হয়েও করতে হয়। এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে কেউ কখনও না কখনও গিয়েছেন। এই চিন্তাকে মাথায রেখে লোকসভায় এক বিল পাশ হয়ে গেল। যাতে এইসব চিন্তা দূর হয়ে যাবে। যে বিলের নাম রাইট টু ডিসকানেক্ট বিল ২০২৫। প্রাইভেট মেম্বারস বিল হিসাবে লোকসভায় তিনটি বিল পেশ ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির সাংসদ সু্প্রিয়া সুলের। তার মধ্যে অন্যতম ‘রাইট টু ডিসকানেক্ট’। এই বিলে অফিস কর্মচারীদের ছুটির পর কোনও মেইল বা ফোন কলের জবাব নাও দিতে পারেন, যদি আপনার মনে হয়। এটা একটি প্রাইভেট মেম্বার বিল। যেটা সরকারের কোনও মন্ত্রী পেশ করেন। লোকসভা ও রাজ্যসভার কোনও মেম্বার এই বিল পেশ করতে পারেন। এর ফলে কী হতে পারে। বিল আনার পর সরকার জবাব দিতে পারে। চর্চা হতে পারে। সামান্য কিছু ম্যাসেজ দিতে পারে এই বিল। সেই জন্য আমেরিকান কংগ্রেস এই বিলটিকে ম্যাসেজিং বিল নাম দেয়। প্রাইভেট মেম্বার বিলের অপর নামই ম্যাসেজিং বিল।

রাইট টু ডিসকানেক্ট বিল, ২০২৫’-এ বলা হয়েছে, অফিসের কাজের সময় শেষ হলে কর্মীকে যাতে কর্মক্ষেত্রের ফোন বা ইমেল দেখতে না হয়, সেই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অফিসের কাজ শেষ হওয়ার পরও ছুটির দিনকে কর্মীদের ‘ব্যক্তিগত সময়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিলে বলা হয়েছে যে একটি কমিটি গঠন করা হবে। যেখানে অফিস শেষ হওয়ার পর কাজ সংক্রান্ত কোনও ইমার্জেন্সি হলে, তা কীভাবে সামাল দেওয়া হবে সেই সংক্রান্ত যাবতীয় শর্তাবলী তৈরি করা হবে। কর্মী ও অফিস যে সময়ে মিলিতভাবে সম্মত হবে একমাত্র সেই নির্দিষ্ট সময়েই অফিস থেকে কর্মীকে ফোন, ভিডিয়ো কল, মেসেজ, ইমেইল বা অন্য কোনও মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারবেন।

শ্রম মন্ত্রকের তরফে সম্প্রতিই চারটি নতুন শ্রম কোড চালু করা হয়েছে যেখানে কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে অধিকার, ওভারটাইমের জন্য অতিরিক্ত টাকা, নির্দিষ্ট কাজের সময়, গ্রাজুয়িটির সুবিধার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক কর্মক্ষেত্রেই এই নিয়ম চালু করা সম্ভব নয়। প্রসঙ্গত, অস্ট্রেলিয়াতে ইতিমধ্যেই গত বছর রাইট টু ডিসকানেক্ট আইন চালু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় কর্মীদের অফিস শেষ হওয়ার পর ফোন বা মেসেজ না ধরার অধিকার দেওয়া হয়েছে। ভারতেও একাধিক সমীক্ষায় এই অধিকারের সপক্ষেই জনগণ মতামত দিয়েছেন। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদর মধ্যে ৭৯ শতাংশই এই নিয়মের সমর্থন করেছেন। ৮৮ শতাংশ কর্মীই জানিয়েছিলেন যে তাদের অফিস শেষ হয়ে যাওয়ারর পরও সর্বক্ষণ অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হচ্ছে। ৮৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা অসুস্থ হলে বা ছুটিতে থাকলেও কাজ সংক্রান্ত মেসেজ আসে। আবার ৭৯ শতাংশ এই শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন যে এই ফোন বা ইমেইলের জবাব না দিলে, তাদের কেরিয়ারে প্রভাব পড়বে, প্রোমোশন আটকে যাবে। ভারতে কত ঘণ্টা কাজ করা উচিত, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চর্চা চলছে। ইনফোসিসের প্রতিষ্ঠাতা নারায়ণ মূর্তি থেকে শুরু করে এল অ্যান্ড টি-র সিইও এসএন সুব্রহ্মণ্যম সপ্তাহে ৭০ থেকে ৯০ ঘণ্টা কাজ করার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, যা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়। এবার সংসদে পেশ হল এই আইন।

এই বিল আনার প্রধান কারণ হিসাবে এনসিপি সাংসদ জানিয়েছেন যে দেশে ক্রমাগত কর্ম সংক্রান্ত মানসিক চাপে কর্মীদের মৃত্যু বা আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে। হার্ভার্ড ও স্ট্যানফোর্ডের একাধিক সমীক্ষাতেও উঠে এসেছে যে অফিস শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ক্রমাগত ইমেইল বা মেসেজ দেখতে গিয়ে কর্মীদের ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে মানসিক স্বাস্থ্যে যেমন প্রভাব পড়ছে, তেমনই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়ছে। বিল অনুযায়ী, যে কোনও রকম যোগাযোগের মাধ্যমই অবহেলা করতে পারেন কর্মীরা। ভিডিয়ো কলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হওয়া উচিত নয়। তবে জরুরি পরিস্থিতির ক্ষেত্রে বিলে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে। বলা বয়েছে, কোনও বাস্তবিক জরুরি পরিস্থিতি যদি তৈরি হয়, সে ক্ষেত্রে কর্মী এবং নিয়োগকর্তার মধ্যে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এই নিয়ম শিথিল হতে পারে। এ ছাড়া, যদি কর্তৃপক্ষ নিয়ম ভাঙেন, কর্মীকে বেতনের এক শতাংশ জরিমানা হিসাবে দেওয়ার কথাও বিলে বলা হয়েছে। আরও একটি ‘প্রাইভেট মেম্বার’স বিল’ পেশ করেছেন কংগ্রেস সাংসদ কাদিয়াম কাব্য। সেটি হল মেন্সট্রুয়াল বেনিফিটস বিল, ২০২৪। এর লক্ষ্য হল ঋতুস্রাবের সময় কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।

লোকসভা বা রাজ্যসভার সাংসদ যদি মনে করেন, কোনও বিষয়ে আইন হওয়া প্রয়োজন, বা আলোচনার দরকার, তা হলে তাঁরা সেই সংক্রান্ত বিল সংসদে পেশ করতে পারেন। অনেক সময় জনমত যাচাইয়ের জন্যও এই বিল আনা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় সরকার সেই প্রস্তাবিত বিল নিয়ে জবাব দিলে তা প্রত্যাহার করা হয়ে থাকে। শুক্রবার যে বিল সুপ্রিয়া পেশ করেছেন, তাতে বলা হয়েছে, কর্মীদের স্বার্থেই আইন হওয়া উচিত।