শুরু হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় গণনা!

আগামী ১ থেকে ১৫ অগস্ট পর্যন্ত প্রথম ১৫ দিন সেল্ফ এমুনারেশনের দিন হিসাবে নির্বাচন করেছে সরকার।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ১ অগাস্ট শুরু হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় গণনা! আপনার বাড়িতেও আসবেন জনগণনার কর্মীরা। এবার কি মোবাইল থেকেই Census-এ নাম নথিভুক্ত করা যাবে? কী কী তথ্য দিতে হবে, আর কোন তথ্য গোপন রাখা যাবে? কোন সাইটে গিয়ে নিজেই সেনসাসে নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন? পড়ুয়ারা কেন এই জনগণনার অংশ হতে চলেছে? আর এই Census-ই কি বদলে দিতে পারে সংরক্ষণ, লোকসভা কেন্দ্রের সীমানা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নীতির সমীকরণ?

প্রথমেই জানতে হবে সেনসাস কী। সেনসাস বা জনগণনা হল দেশের প্রতিটি মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত তথ্য সংগ্রহের সরকারি প্রক্রিয়া। সাধারণত প্রতি ১০ বছর অন্তর এই গণনা করা হয়। এই তথ্যের ভিত্তিতেই সরকার ভবিষ্যতের উন্নয়ন পরিকল্পনা, স্কুল, হাসপাতাল, রাস্তা, পানীয় জল, বিদ্যুৎ এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের রূপরেখা তৈরি করে।

২০১১ সাল পর্যন্ত ভারতে মোট ১৫ বার দশম-বার্ষিক সেনসাস অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ ভারতে ১৮৭২ সালে ভাইসরয় লর্ড মেয়োর আমলে এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতি ১০ বছর অন্তর এটি পরিচালিত হয়ে আসছে। ১৮৭২ সালেই প্রথম পূর্ণাঙ্গ সেনসাস সম্পন্ন হয়। ১৯৪৯ সালের পর থেকে ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেনসাস কমিশনার-এর তত্ত্বাবধানে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৫১ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি প্রথম সেনসাস শুরু হয়েছিল। শেষবার সেনসাস হয়েছিল ২০১১ সালে।

১৯৫১ জনসমীক্ষা

জনসংখ্যা ছিল ৩৬কোটি ১০লক্ষ
ভারতের ১৮% মানুষ স্বাক্ষর ছিলেন
ভারত থেকে ৭২,২৬,০০০ জন মুসলমান পাকিস্তানে যান
পাকিস্তান থেকে ৭২,৪৯,০০০ জন হিন্দু ও শিখ ভারতে আসেন

১৯৫১-র পর জনগণনা হয় ১৯৬১ সালে। সেবারে ছিল দশমতম সেনসাস।

সেনসাসে জনসংখ্যা

১৯৬১- ৪৩কোটি ৮৯লক্ষ
জনসংখ্যা বৃদ্ধি ২১.৫৫%

১৯৭১- ৫৪ কোটি ৭৯ লক্ষ
জনসংখ্যা বৃদ্ধি ২৪.৮৩%

১৯৮১- ৬৮কোটি ৫১লক্ষ
জনসংখ্যা বৃদ্ধি ২৫%

১৯৯১- ৮৩কোটি ৮৫লক্ষ
জনসংখ্যা ২২.৩৮% বৃদ্ধি

২০০১- ১০২ কোটি ৮৭ লক্ষ
যা ছিল ২১.৫% বেশি
পুরুষ: ৫৩কোটি ২২লক্ষ
মহিলা: ৪৯কোটি ৬৫লক্ষ

২০০১ সালের পর জনগণনা হয় ২০১১ সালে। সেবারে লালু প্রসাদ যাদব ও মুলায়ম সিং যাদবের মতো ক্ষমতাসীন জোটের কয়েকজন নেতা দাবি করেন জাতিগত তথ্য সংযুক্ত করার জন্য। সেই দাবিকে সমর্থন জানানো হয় ভারতীয় জনতা পার্টি, শিরোমণি অকালি দল, শিবসেনা -এর মতো বিরোধী দলগুলো। ব্রিটিশ শাসনকালে ১৯৩১ সালে ভারতে জাতি-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। অর্থাৎ দীর্ঘ ৮০ বছর পর জাতি-ভিত্তিক সেনসাস হয়েছিল ২০১১ সালে।

সেনসাসে জনসংখ্যা

২০১১- ১২১কোটি ৮লক্ষ
জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১৭.৬৪%
পুরুষ- ৬২ কোটি ৩৭ লক্ষ
নারী- ৫৮ কোটি ৬৫ লক্ষ
গ্রামীণ জনসংখ্যা- ৮৩ কোটি
শহরাঞ্চলীয় জনসংখ্যা- ৩৭ কোটি
স্বাক্ষরতার হার- ৭৪.০৪%

২০১১-র পর কোভিডের কারণে ২০২১-এ স্থগিত হয়ে যায় সেনসাসের কাজ। ১ অগাস্ট থেকে শুরু হচ্ছে জনগণনার কাজ। ভারতের এই প্রথম ডিজিটাল জনগণনার কাজে এ বার পরোক্ষ ভাবে পড়ুয়াদেরও যুক্ত করা হচ্ছে। সম্প্রতি কলকাতা পুরসভার জনগণনা বিভাগ থেকে স্কুলের প্রধানদের এই মর্মে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্কুলের প্রধানরাও। চিঠিতে জানানো হয়েছে, আগামী ১ অগস্ট থেকে ১৫ অগস্ট পর্যন্ত ভারতের নাগরিকেরা অনলাইনে সেল্ফ এমুনারেশন বা নিজে থেকেই জনগণনায় অংশ নিতে পারবেন। নির্ধারিত পোর্টালে ওটিপি-র মাধ্যমে লগ-ইন করে তথ্য জমা দিলে একটি আই়ডি তৈরি হবে, যা পরবর্তীতে গণনাকারীকে দেখাতে পারবেন। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে এ বার পড়ুয়াদের যুক্ত করতে উদ্যোগী হল সংশ্লিষ্ট দফতর। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রথমে ডিজিটাল জনগণনা সম্পর্কে স্কুলে বিশেষ সচেতনতামূলক সভার আয়োজন করতে হবে। এর পরে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থেকে অন্তত এক জনকে ভারপ্রাপ্ত কর্তার দায়িত্ব দিতে হবে। ওই ছাত্র বা ছাত্রী ক্লাসের অন্য ছাত্রছাত্রীদের সচেতন করবে। এর পরে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী নিজের পরিবার এবং অন্তত ১০টি পরিবারকে স্ব-গণনায় উৎসাহিত করবে। পাশাপাশি প্রতিটি স্কুলে এক জন নোডাল সেনসাস টিচার নিয়োগ করে পুরসভার সঙ্গে সমন্বয় রাখতে হবে।

আগামী ১ থেকে ১৫ অগস্ট পর্যন্ত প্রথম ১৫ দিন সেল্ফ এমুনারেশন দিন হিসাবে নির্বাচন করেছে সরকার। এই সময়ের মধ্যে নাগরিকেরা অনলাইনে তথ্য জমা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। সে জন্য তাঁদের জনগণনা সম্পর্কিত পোর্টাল https://se.census.gov.in-এ লগ ইন করতে হবে প্রথমে। জনগণনার প্রয়োজনীয় যাবতীয় তথ্য সেখানেই পূরণ করা যাবে।

এ বারের জনগণনা দুটি পর্যায়ে পরিচালিত হবে। প্রথম পর্যায়ে বাড়ি তালিকাভুক্তি ও গৃহগণনা হবে। যেখানে বাড়ির অবস্থা, পরিবারের বৈশিষ্ট্য, পানীয় জল, শৌচাগার, বিদ্যুৎ, রান্নার জ্বালানি, ইন্টারনেট সংযোগের মতো পরিষেবা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। রেডিয়ো, টেলিভিশন, কম্পিউটার, দুই এবং চার চাকার গাড়ির মতো সম্পদের তথ্যও নেওয়া হবে। ১৬ অগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে ওই পর্ব। এই সময়ের মধ্যেই বাড়ি তালিকাভুক্তি ও গৃহগণনার কাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে প্রশাসন। এইসময় বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যাবেন জনগণনার কর্মীরা।

সব মিলিয়ে, ২০২৭ সালের জনগণনা শুধু দেশের জনসংখ্যা গণনার প্রক্রিয়া নয়, বরং আগামী দিনের প্রশাসনিক ও নীতিগত সিদ্ধান্তের অন্যতম ভিত্তি হতে চলেছে। প্রথমবারের মতো ডিজিটাল সেল্ফ-এনুমারেশন, স্কুলভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার এই জনগণনাকে আরও আধুনিক করে তুলছে। তাই নির্ধারিত সময়ে সঠিক তথ্য দিয়ে জনগণনায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। কারণ, আজ আপনি যে তথ্য দেবেন, তার উপরই নির্ভর করবে আগামী দিনে উন্নয়ন পরিকল্পনা, সরকারি প্রকল্পের রূপরেখা, এমনকি সংরক্ষণ ও নির্বাচনী কেন্দ্র পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও।