অপারেশন রোরিং লায়ন- এই খতম খামেনেই!

কয়েক মাস ধরে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর গোপনে নজর রাখছিল ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা। খামেনির দৈনন্দিন রুটিনেও ছিল নজর।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে চার দশকের সবচেয়ে শক্তিশালী মুখ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। একজন ব্যক্তি, যার এক নির্দেশে বদলে যেত আঞ্চলিক সমীকরণ। সেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আজ আর নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ অভিযানে তেহরানের বুকে নিহত হয়েছেন ৮৬ বছর বয়সী এই সর্বোচ্চ নেতা।
অভিযানের নাম- “অপারেশন রোরিং লায়ন”। কিন্তু প্রশ্ন একটাই- কীভাবে সম্ভব হল এই হামলা? কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত নেতাদের একজনকে লক্ষ্যবস্তু করা হল?

সূত্র বলছে, কয়েক মাস ধরে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর গোপনে নজর রাখছিল ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা। বিশেষ করে মার্কিন Central Intelligence Agency। খামেনির দৈনন্দিন রুটিন-


কোথায় থাকেন ? কার সঙ্গে দেখা করেন ? কীভাবে যোগাযোগ করেন ? হামলার আশঙ্কায় কোথায় আশ্রয় নেন? –
সবকিছু বিশ্লেষণ করা হচ্ছিল

ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা সচরাচর একই স্থানে একসঙ্গে বৈঠক করতেন না। কিন্তু কয়েকদিন আগে সেই বিরল সুযোগ তৈরি হয়।

শনিবার সকাল। তেহরানের একটি সুরক্ষিত কমপাউন্ড। এখানেই রয়েছে সর্বোচ্চ নেতার অফিস, প্রেসিডেন্সিয়াল কার্যালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা দফতর। সকালবেলায় খামেনি তুলনামূলক নিরাপদ মনে করতেন নিজেকে। রাতের পরিবর্তে দিনের আলোতে হামলার সম্ভাবনা কম- এমনটাই ধারণা ছিল তার। এই সুযোগটাই কাজে লাগায় ইজরায়েল। ইজরায়েলের সেনাপ্রধান আযয়াল জামির পাইলটদের উদ্দেশে বার্তা দেন- “শনিবার ভোরে শুরু হবে অপারেশন রোরিং লায়ন। তোমরা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার অনুমতি পেয়েছো। আমরা ইতিহাস তৈরি করছি।”


সকাল প্রায় ৬টা
ইজরায়েলি যুদ্ধবিমান আকাশে উঠে যায়
উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়
একযোগে আঘাত করা হয় তিনটি স্থাপনায়
যেখানে উপস্থিত ছিলেন খামেনি ও শীর্ষ সামরিক নেতারা

সূত্র অনুযায়ী, বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন-


আলি শামখানি
ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ডের প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর
প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদে
আরও একাধিক সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা

হামলাটি ছিল অত্যন্ত সমন্বিত। দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও উচ্চ-নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। তিনটি স্থানে একসঙ্গে আঘাত হানায় পালানোর সুযোগ পাননি কেউ। কয়েক ঘণ্টা পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দেন- “তিনি আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি ও অত্যাধুনিক ট্র্যাকিং সিস্টেম এড়াতে পারেননি।” এর আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বলেন- “আজ আমরা একটি অভিযানে খামেনিকে হত্যা করেছি।”

কেন এবার সফল হল?

২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইজরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধে খামেনিকে লক্ষ্য করার সুযোগ পাওয়া যায়নি। তখন ইরানি সেনাবাহিনী তাকে গোপন স্থানে সরিয়ে নেয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আলাদা ছিল। মাসের পর মাস সামরিক প্রস্তুতি চলেছে। দুটি বিমানবাহী রণতরী, শতাধিক যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন মোতায়েন করা হয় মধ্যপ্রাচ্যে। ওয়াশিংটনে বারবার বৈঠক হয়েছে। মার-আ-লাগোতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বৈঠক হয় বড়দিনের পরপরই। কূটনৈতিকভাবে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির আলোচনা চললেও, শেষ পর্যন্ত সামরিক পথই বেছে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। জেনেভায় শেষ দফা আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হলে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।

ইরানের প্রতিক্রিয়া

ইরান আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়- “আমেরিকা খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ পাবে। আমরা চুপ করে বসে থাকব না।” রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করে, হামলায় খামেনির পরিবারের সদস্যরাও নিহত হয়েছেন। তেহরানে শোক ও ক্ষোভের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

চার দশকের নেতৃত্বের অবসান হল এক সকালের হামলায়। একটি অপারেশন দেখিয়ে দিল মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য কত দ্রুত বদলে যেতে পারে। কিন্তু এখানেই কি শেষ? নাকি এটি একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধের সূচনা? বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে তেহরানের দিকে। কারণ ইতিহাস বলে- মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিটি হামলারই প্রতিধ্বনি দীর্ঘ হয়। ব্যুরো রিপোর্ট আর প্লাস নিউজ।